প্রধান উপদেষ্টার সাথে বৈঠকে অভিযোগ জামায়াতের

প্রশাসন একটি দলের দিকে হেলে পড়েছে

Printed Edition
first-2
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহের। তিনি বলেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় ও হতাশা সৃষ্টি হবে। একইসাথে নির্বাচনী মাঠে সমতার নীতি ভঙ্গ হলে দায় এড়াতে পারবে না নির্বাচন কমিশন।

গতকাল রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বৈঠক শেষে রাত ৮টায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব কথা বলেন ডা: তাহের। এর আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বৈঠকে অংশ নিতে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রবেশ করেন। সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে যমুনায় প্রবেশ করেন তারা। প্রতিনিধি দলে আরো ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে তাদের বৈঠক শুরু হয়ে চলে ঘণ্টাব্যাপী। ডা: তাহের বলেন, আমরা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভিন্ন চিত্র দেখছি, এসব বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এখানে দু’টি প্রধান বিষয় ছিল, এক ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব। কিছু কিছু জায়গায় একই বিষয়ে ইসির ভিন্ন আচরণ দেখছি। একটি দল থেকে ইসিকে চাপ দেয়া হচ্ছে, তবে চাপে নতি স্বীকার না করে সব দলের জন্য একই নিয়মে হতে হবে।

তিনি বলেন, সারা দেশে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণে বিএনপির প্রতি পক্ষপাতের বিষয়টি এখন দৃশ্যমান। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা এসপি ও ডিসিদের যারা একইসাথে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন আচরণে নিরপেক্ষতার ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকর্তাদের একটি তালিকা তারা ইতোমধ্যে করেছেন বলেও জানান তিনি। তবে আপাতত বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং এখনো লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়নি।

ডা: তাহের অভিযোগ করেন, গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে একটি দলের শীর্ষ নেতাকে ঘিরে সরকারের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও প্রটোকল দেয়ার প্রবণতা নির্বাচনী মাঠে সমতার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, কারো নিরাপত্তা বা প্রটোকলে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের প্রতিও একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এটি পক্ষপাতমূলক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এ ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জাতি একে পক্ষপাতমূলক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। ডা: তাহের জানান, এসব বিষয় তারা সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা না নিলে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে প্রধান উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান। তবে তার আশপাশে থাকা কিছু উপদেষ্টা তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ তুলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আহ্বান জানান জামায়াতের নায়েবে আমির।

বৈঠককালে দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডা: তাহের। তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টা তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, যদি সত্যিই প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়, তাহলে এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা দেখব। এ কারণে প্রধান উপদেষ্টাকে আগাম ধন্যবাদ জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ইসলামী আন্দোলনের সম্মানে দলটির নায়েবে আমিরের আসনে প্রার্থী দেবে না জামায়াত জোট : শেষ মুহূর্তে ১১ দলীয় নির্বাচনী সমঝোতা থেকে সরে যাওয়া ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিমের আসনে কোনো প্রার্থী দেবে না জামায়াত জোট। ডা: তাহের বলেন, এই সমঝোতায় ইসলামী আন্দোলনের অনেক ভূমিকা ছিল, আমরা সেই ভূমিকা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। টুকটাক টেকনিক্যাল কিছু বিষয়ের জন্য তারা নিজেরা আলাদা নির্বাচনের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা নির্বাচনে তাদের সাফল্য কামনা করি। আর ইসলামী আন্দোলনের সম্মানে দলের সিনিয়র নায়েবে আমিরের আসনে আমরা কোনো প্রার্থী দেবো না। কারণ তাদের আমির পীর সাহেব নির্বাচন করছেন না। তাই সৌজন্যের জন্য আমরা এই আসনে প্রার্থী দেবো না।

কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বৈঠক : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে গতকাল কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। অধিবেশনে সংগঠনের নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, নির্বাহী পরিষদের সদস্য এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্যরা যোগদান করেন। কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার নতুন সদস্য হিসেবে অধিবেশনে কয়েকজন শপথ গ্রহণ করেন। জামায়াত আমির নতুন সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে নিয়ে আসা, কোনো বিশেষ দলের দিকে হেলে না পড়া, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি দাবি জানানো হয়। এ ছাড়াও সংগঠনের সর্বস্তরের জনশক্তিকে সর্বোচ্চ ধৈর্য, সবর ও হিকমাহর সাথে ময়দানে ভূমিকা পালন করে একটি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার বিষয়ে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার প থেকে আহ্বান জানানো হয়।

সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের সৌজন্য সাক্ষাৎ : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের সাথে বাংলাদেশে নিযুক্ত সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি রাজধানীর বসুন্ধরাস্থ কার্যালয়ে গতকাল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্প ও বাণিজ্য, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পারস্পরিক মতবিনিময় করা হয়। মিচেল লি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিবাচক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সাথে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।