দায়িত্ব নেয়ার চার মাসে ২২৫টি কাজ ও উদ্যোগ গ্রহণ ডাকসুর

Printed Edition

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম চার মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ২২৫টি কাজ করেছে এবং উদ্যোগ নিয়েছে।

গতকাল মধুর ক্যান্টিনের সামনে আয়োজিত ‘ডাকসুর চার মাস : কার্যবিবরণী ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কাজ ও উদ্যোগের বিবরণী তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ‘দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম চার মাসে ডাকসুর কার্যক্রমের বিবরণী’ ও ‘প্রতিনিধি সম্মেলন ২০২৫’ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে চার মাসের কার্যবিবরণী পেশ করেন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। এ সময় তিনি বলেন, আমরা ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। তবে ১০ সেপ্টেম্বর যে দিন ফলাফল ঘোষণা করা হয় সে দিনই আমরা বলেছিলাম আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের কাজের জবাবদিহি করব। তার ধারাবাহিকতায় গত ডিসেম্বরে আমরা ডাকসু ও হল সংসদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সম্মেলন করি। সেখানে আমরা আমাদের দু’মাসের কাজগুলো জানিয়েছিলাম। হল সংসদের প্রতিনিধিরাও তাদের কাজগুলো জানিয়েছিলেন এবং সমস্যার কথাও জানিয়েছিলেন। আমরা আজকে দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসে ডাকসু যেসব কাজ করেছে ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে সেসব বিষয় সবার কাছে তুলে ধরছি। পাশাপাশি ডাকসুর কাজের ডকুমেন্টেশনের জন্য দু’টি স্মারক গ্রন্থ তৈরি করা হয়েছে। সেগুলোরও মোড়ক উন্মোচন করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, আমরা আমাদের যে ইশতেহার দিয়েছিলাম এবং অন্য যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের সবার ইশতেহারগুলো নিয়ে নোট ডাউন করেছিলাম। যতগুলো ইশতেহার ছিল আমরা সবগুলোতে কাজ করার চেষ্টা করেছি। এমন কোনো ইশতেহার নেই যে আমরা যেগুলোতে কোনো কাজ করিনি বা উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। সবগুলো জায়গায় আমরা কাজ করেছি কিংবা কাজের উদ্যোগ নিয়েছি। এরপরেও যদি শিক্ষার্থীদের চোখে কোনো বিষয়ে মনে হয় আমরা কোনো কাজ করিনি সেটি আমাদের জানালে আমরা সেটি নিয়ে অবশ্যই কাজ করব।

সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনকে সামনে রেখে আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের সবচেয়ে বড় সঙ্কট ছিল বাজেটের অভাব। দীর্ঘ দিন ধরে ডাকসু কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল। আজ বিশ্ববিদ্যালয় ১০৪ বছরে পা রেখেছে, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে; অথচ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার চেষ্টা চলছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্তরে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারা চায় না শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর থাকুক, চায় না স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠিত হোক।

তিনি বলেন, এই অকার্যকর অবস্থান বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে অসহযোগিতা করা হয়েছে। বিভিন্ন পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, নানাভাবে কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হয়েছে। তবু আমরা আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে গেছি। বাজেটের অজুহাতে বসে থাকিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই, দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে থাকা রিসোর্স পারসন এবং দাতাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা কাজ এগিয়ে নিয়েছি।

তিনি আরো বলেন, আজ আমরা চাইলে বলতে পারতাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফান্ড পাইনি, তাই কাজ করতে পারিনি; কিন্তু আমরা সেই পথ বেছে নিইনি। আমাদের সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আজ পর্যন্ত প্রায় ২২৫টি কাজ সম্পন্ন করেছি, যা ৩৩টি খাতে বিভক্ত। এর বিস্তারিত তথ্য আমাদের ওয়েবসাইট ও আপনাদের হাতে দেয়া বুকলেটে প্রকাশ করা হয়েছে।

আজকের এই প্রেস কনফারেন্স শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয় উল্লেখ করে সাদিক কায়েম বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন রয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যেই আসুক, আমরা এমন একটি জবাবদিহিতামূলক সরকার দেখতে চাই, যারা স্পষ্টভাবে বলবে কী করেছে, কী করেনি। আমাদের প্রতিটি কাজের ইনস অ্যান্ড আউট শিক্ষার্থী ও দেশবাসীর সামনে উন্মুক্ত। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দলগুলোও এই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি অনুসরণ করবে।

সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা গত চার মাসে ডাকসুর কাজের মধ্যে রয়েছে : ডাকসু নির্বাচনকে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারের অন্তর্ভুক্ত করে প্রতি বছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রেজুলেশন আকারে প্রস্তাব পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পাঠানো, ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় শেখ হাসিনার আজীবন সদস্যপদের এখতিয়ারবহির্ভূত রেজুলেশন বাতিল, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদে এয়ারকন্ডিশনসহ জরুরি সংস্কারকাজ, এক হাজার ৫০০ ছাত্রী ধারণক্ষমতার ছাত্রী হল নির্মাণ দ্রুততর করার লক্ষ্যে চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে দফায় দফায় আলোচনা, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যৌথভাবে কাজ করা এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাঁচটি হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে সম্মতি আদায়, ছাত্রীদের ইবাদতের জন্য কার্জন হলের কমনরুমে নির্ধারিত স্থান ও মসজিদ সংস্কারের কাজ শুরু করা, কমনরুমগুলো ও টিএসসির নামাজের স্থানে নতুন কার্পেট প্রদান করা হয়েছে, ডাকসুর ওয়েবসাইট চালু করা, আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সসহ ১০টি এয়ারকন্ডিশনার ও এক্স-রে মেশিন-ইসিজি মেশিন-এনালাইজার-মাইক্রোস্কোপসহ হাসপাতাল বেড ও আলমিরা-চেয়ার-ডেস্ক প্রভৃতি প্রদানসহ সম্পূর্ণ মেডিক্যাল সেন্টার সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা, ৫০% ছাড়ে চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টারের সাথে এমওইউ স্বাক্ষর করা, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক কর্তৃক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে ১১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা প্রদান করা, হল-ভিত্তিক মোট ১৮ বার ছারপোকার ওষুধ দেয়া।

উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আরো রয়েছে : অ্যাকাডেমিক এরিয়া-সহ ছাত্রী হলগুলোয় বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ, সোচ্চার-এর সাথে যৌথ উদ্যোগে সিকিউরিটি সেশন অ্যান্ড ব্রেন্ট ব্লিম শীর্ষক ইন্টারাক্টিভ সেশন আয়োজন করা, সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে ব্রেস্ট ক্যান্সার এওয়ারনেস শীর্ষক সেমিনার, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সহযোগিতায় দু’টি মেডিক্যাল ক্যাম্পে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীকে সেবা দেয়া, বারডেম হাসপাতালের সহযোগিতায় শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য স্বল্প খরচে ব্রেস্ট ক্যান্সার চেকআপের সুযোগ প্রদান।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে ডাকসু সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বিজয় কুইজ প্রতিযোগিতা, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস স্মরণ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মুনির চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার শীর্ষক স্মরণিকার জন্য লেখা আহ্বান, ‘বিজয়ের রঙতুলি’ শীর্ষক আলপনা উৎসব, বিজয় দিবসে ‘বিজয় সাইকেল র‌্যালি ও স্ট্যান্ট শো’ আয়োজন, ‘যুদ্ধ দিনের গল্প শুনি’ শীর্ষক মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান, ‘বিজয়ের কথা’ শীর্ষক প্রকাশনার জন্য লেখা আহ্বান, মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। এ ছাড়াও ডাকসু সিরাতুন্নবী সা: সন্ধ্যা ও সিরাত প্রতিযোগিতা, নবান্ন উৎসব, নাট্যোৎসবসহ কয়েকটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

এ ছাড়াও গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধকরণের জন্য চারটি সেমিনার আয়োজন, সাতটি প্রসিদ্ধ জার্নালে ফ্রি অ্যাক্সেসের ব্যবস্থা করা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে আলো স্বল্পতা দূর করতে লাইটিং ও বিজ্ঞান লাইব্রেরিতে নতুন ফ্যান সংযোজন করা, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে পরীক্ষার হল বরাদ্দ প্রথা বাতিল করা, শিক্ষার্থীদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য সফট স্কিল প্রশিক্ষণের আয়োজন, চারটি প্রেজেন্টেশন ওয়ার্কশপ আয়োজন, স্পোকেন ইংলিশের চারটি কোর্স চালু করা, বিভিন্ন সেক্টরের প্রফেশনালস এবং শিক্ষাবিদদের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ স্কিল সামিট আয়োজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে ২৯টি ই-রিসোর্স সাবস্ক্রাইবের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ ছাড়াও ডাকসুর উদ্যোগে বিএনসিসি এবং রোভার স্কাউট ও রেঞ্জার সদস্যদের অংশগ্রহণে দুই দিনব্যাপী ‘ফায়ার ফাইটিং, সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ , ‘ফার্স্ট এইড অ্যান্ড আর্থকোয়াক ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং’ সম্পন্ন, লাইফ স্কিল প্রশিক্ষণের আওতায় ৫০০ জন শিক্ষার্থীকে মোটরসাইকেল চালনা প্রশিক্ষণ চালু, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে প্রাথমিক চিকিৎসাবিষয়ক ১৮টি প্রশিক্ষণ প্রদান, দু’টি ইনস্টিটিউট এবং তিনটি ছাত্রী হলে মোট পাঁচটি সেলফ ডিফেন্স প্রশিক্ষণ প্রদান, ছাত্রীদের জন্য পৃথক জিমনেসিয়াম নির্মাণের কাজ শুরু করা, দুই দফায় ১৮টি হলে মোট ৩৬ বার পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন কর্মসূচি, শব্দদূষণ রোধে ডিইউআরসি-এর সহ-উদ্যোগে ১০ কিমি রান সম্পন্ন করা, কপ-৩০ জাতিসঙ্ঘ সম্মেলন উপলক্ষে ঢাবি টু জাবি সাইকেল র‌্যালি আয়োজন করা হয়েছে।

পরিবহন খাতে ডাকসুর কাজের মধ্যে রয়েছে- জরাজীর্ণ বাস পরিবর্তন এবং ট্রিপ ও সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইউজিসিসহ অংশীজনদের সাথে বৈঠকের মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি টাকার বাজেটের ব্যবস্থা করা, সব রুটে বহুল কাক্সিক্ষত সান্ধ্যকালীন বাস ট্রিপ চালু করা, ক্যাম্পাসে অভ্যন্তরীণ যাতায়াতে ১৯টি ইলেকট্রিক শাটল চালু করা, সব ছাত্রী হলকে ক্যাম্পাস শাটলের আওতাভুক্ত করা, ক্ষণিকা রুটের বাসগুলোর এক্সপ্রেসওয়ে টোল ফ্রি করে পরিবহন অফিসের সাথে সমন্বয় করা।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন- কমনরুম-রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক উম্মে সালমা, আন্তর্জাতিক সম্পাদক জসীম উদ্দীন খান, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, সমাজসেবা সম্পাদক যুবাইর বিন নেসারী (এবি যুবায়ের), ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ, মানবাধিকার ও আইনবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ জাকারিয়া, কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন নাহার তামান্না, ইমরান হোসাইন, মোছা: আফসানা আক্তার, তাজিনুর রহমান, রায়হান উদ্দিন, আনাস ইবনে মুনির, মো: রাইসুল ইসলাম, মো: শাহিনুর রহমান।