‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে ব্যাংক বাঁচল, পথেই বসল বিনিয়োগকারীরা

Printed Edition

নাসির উদ্দিন চৌধুরী

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করা ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ পুঁজিবাজারের হাজার বিনিয়োগকারীকে পথে বসিয়ে নিজের অস্তিত্ব টেকাল। এই পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারের স্পন্সরদের অংশ বাদ দিলে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ারের অভিহিত মূল্যই দাঁড়াচ্ছে চার হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, যা সরকারের জন্য খুব বড় টাকা বলা যায় না। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সিদ্ধান্তেই শূন্য হয়ে গেল হাজার কোটি টাকার উপরে মূলধনসমৃদ্ধ পাঁচ-পাঁচটি ব্যাংক।

সরকারের অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা এসব ব্যাংক সব আইন মেনে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর যেখানে এসব ব্যাংকের হাজার হাজার আমানতকারী ও কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করা অগণিত বিনিয়োগকারী যেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সিদ্ধান্তেই নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে গেল। আবার আমানতকারীদের আমানত ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দায়িত্ব নিতে রাজি হলেও অগণিত বিনিয়োগকারীর হাজার হাজার কোটি টাকার কোনো সুরাহা না করেই নতুন বছরের প্রথম দিন যাত্রা শুরু করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর পৃথক পৃথক চিঠিতে পাঁচ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ব্যাংকগুলোর শেয়ারমূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শেয়ার-প্রতি নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এর আগে গত অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর একবার তালিকাভুক্ত এসব ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়ে কিছু করার নেই এমন কথা বলার পর অর্থ উপদেষ্টা বিষয়টিকে গভর্নরের ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করে বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না নেয়ায় গত ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানিগুলোর লেনদেন স্থগিত করে দেয়। আসলে ওই দিনই কপাল পুড়েছে বিনিয়োগকারীদের। আর এর মাধ্যমে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর কষ্টার্জিত পুঁজি যেমন শেষ হয়ে গেল তেমনি এসব ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগ করা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকা স্রেফ নেই হয়ে গেল।

উল্লিখিত সাবেক পাঁচটি ব্যাংক এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এসব ব্যাংকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ছিল অভিহিত মূল্যে দুই হাজার ১৮৪ কোটি চার লাখ ৪০ হাজার ৮৪০ টাকার। অপর দিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ব্যাংকগুলোর শেয়ার ছিল অভিহিত মূল্যে দুই হাজার ২৫৫ কোটি ৬০ লাখ ৬০০ টাকার। স্পন্সর বাদ দিয়ে এই উভয় ক্যাটাগরির বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের অভিহিত মূল্যে মোট মূল্য দাঁড়ায় চার হাজার ৪৪০ কোটি টাকারও কম। অথচ আমাদের দেশে মাত্র কয়েকটি শিল্প গ্রুপের হাতেই খেলাপি হয়ে আছে লাখ কোটি টাকার ঋণ।

তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে এর দায় বর্তায় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনেরও (বিএসইসি)। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বিএসইসি একটি চিঠিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যাংকগুলোর সম্পদমূল্য ও ব্র্যান্ডভ্যালুসহ অন্য যেসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে তালিকাচ্যুত না করার পরামর্শ দেয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয় ব্যাংকগুলোর এ অবস্থার জন্য দায়ী এগুলোর স্পন্সররা। বিনিয়াগকারীরা কিছুতেই এ দায় নিতে পারেন না। তারা সরকারের সব আইন মেনেই এখানে বিনিয়োগ করেছেন। তাই প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে হলেও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ দরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ চিঠি কোনো কাজেই আসেনি। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সরকার তথা কেন্দ্র্র্র্র্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত বড় হুমকির মধ্যে ফেলেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) যেটি যেকোনো দুঃসময়ে নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করে পুঁজিবাজারকে সহযোগিতা করত সেই প্রতিষ্ঠানটিও একই কারণে শেষ হওয়ার পথে। গত অর্থবছরে কোম্পানিটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানের শিকার হয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটিকে লোকসান গুনতে হয়েছে এক হাজার ২১৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আইসিবি থেকে পাওয়া এক তথ্য অনুসারে এসব ব্যাংকের শেয়ারে আইসিবি ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ছিল ১৪০ কোটি টাকারও বেশি। আইসিবি ছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত তালিকাভুক্ত আরো কয়েকটি কোম্পানির বড় বিনিয়োগ ও আমানত ছিল ব্যাংকগুলোতে, যার প্রায় পুরোটাই এখন হুমকির মুখে।

এ দিকে নতুন বছরের প্রথম দিন থেকেই স্বাভাবিক লেনদেনে ফিরেছে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাংকটির শাখাগুলোতে আমানতকারীদের টাকা উত্তোলন ও জমা দেয়ার চিত্র দেখা গেছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংক- এই পঁাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে এখন থেকে একক ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনেক শাখায় ইতোমধ্যে আগের সাইনবোর্ড সরিয়ে নতুন ব্যাংকের ব্যানার ও নাম টাঙানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্রোকার্সদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা এখনো আশা ছাড়িনি। বিনিয়োগকারীদের বিষয়টি নিয়ে আমরা সরকারের সাথে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছি। এটির একটি যৌক্তিক সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ হয়ে আমাদের দাবি অব্যাহত রাখব।