গাজার আড়ালে পশ্চিমতীরে নীরব যুদ্ধ উচ্ছেদ ও ভয়কে অস্ত্র বানাচ্ছে ইসরাইল
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজাজুড়ে ইসরাইলি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা
- শীতে গাজা ‘ক্যাটাস্ট্রোফি’র চেয়েও ভয়াবহ- এমএসএফ
- গাজার ‘বোর্ড অব পিস’-এ আইসিসি পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু
গাজায় চলমান যুদ্ধ ও কথিত যুদ্ধবিরতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগের আড়ালে অধিকৃত পশ্চিমতীরে ব্যাপক সামরিক অভিযান জোরদার করেছে ইসরাইল। সামরিক অভিযান, অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, অবকাঠামো ধ্বংস এবং গণউচ্ছেদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাপনকে ক্রমেই অসম্ভব করে তোলা হচ্ছে। খবর আলজাজিরার।
২০২৫ সালে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি ঘরছাড়া হয়েছেন, যা ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বড় উচ্ছেদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জেনিন ও তুলকারেমের শরণার্থী শিবির প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে সেখানে ইসরাইলি সেনারা স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করেছে। এসব এলাকায় সড়ক, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যার ফলে হাজারো পরিবার মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত।
এ ছাড়া রামাল্লাহ, জেরিকো, বেথলেহেম ও আল-খলিল (হেবরন) শহরে নিয়মিত সামরিক অভিযান চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি আল-খলিলে বড় আকারের অভিযানে পুরো শহর অবরুদ্ধ করা হয়। ট্যাংক মোতায়েন করে পুরুষ ও কিশোরদের আটক, মাঠপর্যায়ের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত, ৮৮ জন আহত এবং ১৮০ জন গ্রেফতার হচ্ছেন। একই সময়ে শতাধিক সামরিক অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সহিংসতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভয়কে শাসনব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চেকপয়েন্ট, রাস্তা বন্ধ ও আকস্মিক অভিযানের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল, সময় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা হারানো এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। পর্যবেক্ষকদের মতে, পশ্চিমতীরে এই নীরব যুদ্ধ কার্যত দখল ও ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ী রূপ দেয়ার কৌশল।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই গাজাজুড়ে ইসরাইলি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজা উপত্যকার উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। আলজাজিরার সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, কামান থেকে গোলাবর্ষণ ও হেলিকপ্টার গানশিপের গুলিতে গাজাজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চল, মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবির এবং দেইর আল-বালাহর আশপাশে গোলাবর্ষণ করা হয়। একই সাথে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় আবাসিক ভবন গুঁড়িয়ে দেয় ইসরাইলি সেনারা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এ পর্যন্ত অন্তত ৪৮৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৬৯ জন শিশু ও ৬৪ জন নারী রয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও বাস্তবে হামলা কখনোই থামেনি। স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির শর্ত কার্যকর না হওয়ায় গাজায় মানবিক পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি, বরং সহিংসতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
শীতে গাজা ‘ক্যাটাস্ট্রোফি’র চেয়েও ভয়াবহ -এমএসএফ
গাজায় চলমান মানবিক সঙ্কটকে ‘ক্যাটাস্ট্রোফি’ শব্দেও ব্যাখ্যা করা যায় না বলে মন্তব্য করেছে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)। সংস্থাটির গাজা প্রকল্প সমন্বয়কারী হান্টার ম্যাকগভর্ন বলেন, শীত, বৃষ্টি ও ইসরাইলি হামলা মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। তিনি জানান, হাজারো মানুষ প্লাস্টিক শিট ও জরাজীর্ণ তাঁবুতে বসবাস করছে। বৃষ্টি ও ঠাণ্ডায় শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক পরিবার ভেজা কম্বলের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। ম্যাকগভর্ন আরো বলেন, ‘শিশু এমনকি প্রাপ্তবয়স্করাও ঠাণ্ডায় মারা যাচ্ছে। সাহায্য আসছে না, আশ্রয় সামগ্রীও নেই।’ এমএসএফ নিজেও ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অবিলম্বে সহায়তা না বাড়ালে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরো গভীর হবে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
গাজার ‘বোর্ড অব পিস’-এ আইসিসি পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু
ফিলিস্তিনের গাজায় প্রস্তাবিত শান্তি পরিষদ তথা বোর্ড অব পিসে যোগ দিতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন ঘোষিত যুদ্ধাপরাধী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গাজায় গণহত্যা চালানো ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ওই পরিষদে যোগ দেয়ার সম্মতিও দিয়েছেন।
গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহুর দফতর বিষয়টি নিশ্চিত করে। এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। খবর আলজাজিরার। বোর্ড অব পিসে যোগ দিতে বিশ্বের ৬০টি দেশের প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাওয়া এই সংস্থার মাধ্যমে প্রথমে গাজায় এরপর বিশ্বের বাকি সঙ্ঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তবে যুদ্ধাপরাধী নেতানিয়াহু আমন্ত্রণ পাওয়ায় এই বোর্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
‘বোর্ড অব পিস’ মূলত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সাথে দখলদার ইসরাইলের যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের একটি অংশ। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বোর্ড গাজার শাসনব্যবস্থা গঠন, আঞ্চলিক সম্পর্কোন্নয়ন, পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বড় পরিসরে অর্থায়ন তদারক করবে। তবে বোর্ডটির নেতৃত্ব ও সদস্য নির্বাচন সরাসরি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে থাকায়, এতে নেতানিয়াহুর অন্তর্ভুক্তি বোর্ডটির নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
রাফাহে নিয়ন্ত্রিত সামরিক অঞ্চল তৈরির প্রস্তুতি ইসরাইলের
গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফাহতে পরিকল্পিতভাবে বিস্তীর্ণ এলাকা পরিষ্কার করছে ইসরাইল- এমন তথ্য উঠে এসেছে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। ফরেনসিক আর্কিটেকচার ও ড্রপ সাইট প্ল্যাটফর্মের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বর্গকিলোমিটার এলাকায় মাটি সমতল করা, ধ্বংসাবশেষ অপসারণ ও ভূমি শক্ত করার কাজ চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনিদের একটি সম্পূর্ণ ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তুতি হতে পারে। এলাকাটি সেই তথাকথিত ‘মানবিক শহর’-এর কাছেই অবস্থিত, যেখানে পুরো গাজার জনগোষ্ঠীকে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথা আগেই জানিয়েছিলেন ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
জাতিসঙ্ঘ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে এবং এতে গাজার মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হতে পারে।