চায়নাতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ‘ভিলেজ সুপার লিগ’

Printed Edition
khela-4
চীনের হেবেই প্রদেশের ফুপিং কাউন্টিতে ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার অপেক্ষায় খুদে পরিবেশনার শিল্পীরা : ইন্টারনেট

আশিকুর রহমান

চীনের পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল এবারের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। ২০০২ সালের পর আর কখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগও পায়নি বিশ্বেও শীর্ষ জনসংখ্যার দেশটি। দীর্ঘ এই ব্যর্থতা সত্ত্বেও দেশটির মানুষের ফুটবলপ্রেমে ভাটা পড়েনি। বরং পেশাদার ফুটবলের নানা সঙ্কট, দুর্নীতি ও আর্থিক অস্থিরতার মধ্যে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা ‘ভিলেজ সুপার লিগ’ এখন চীনে ফুটবলের নতুন প্রাণ হয়ে উঠেছে। গ্রাম ও ছোট শহরভিত্তিক এই অপেশাদার টুর্নামেন্ট শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পর্যটনের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সম্প্রতি উত্তর চীনের হেবেই প্রদেশের পাহাড়ি ও গ্রামীণ অঞ্চল ফুপিং কাউন্টিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে স্থানীয় ভিলেজ সুপার লিগের ফাইনাল। হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। খেলা শেষে বিজয়ী দলকে ঘিরে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন সমর্থকেরা। শ্যাম্পেন ছিটিয়ে উদযাপন, কাগজের রঙিন ফিতা, করতালি ও মোবাইল ফোনে মুহূর্ত ধারণ, সব মিলিয়ে পরিবেশটি অনেকটা আন্তর্জাতিক কোনো বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালের আবহ তৈরি করে।

বিশেষত্ব হলো, এই লিগে অংশ নেয়া খেলোয়াড়রা কেউ পেশাদার ফুটবলার নন। তারা নিজ নিজ জীবনে চিকিৎসক, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, কৃষক, কারখানার কর্মী বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী। দিনের কাজ শেষ করে অনুশীলন করেন এবং স্থানীয় দলের হয়ে মাঠে নামেন। তাদের লক্ষ্য স্থানীয় লিগে সাফল্য অর্জন করে জাতীয় পর্যায়ের ভিলেজ সুপার লিগের চূড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করা।

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র গুইঝো প্রদেশের রংজিয়াং কাউন্টিতে প্রথম এই ভিলেজ সুপার লিগের সূচনা হয়। ২০২৩ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর উৎসবমুখর পরিবেশ, দর্শকদের বিপুল আগ্রহ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির উপস্থাপন ব্যাপক সাড়া ফেলে। সেই জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৬০টি আঞ্চলিক লিগ চালু হয়েছে, যেখানে শত শত দল অংশ নিচ্ছে। এসব লিগের সেরা দলগুলো জাতীয় পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

ফুপিং কাউন্টির ফাইনালও ছিল শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। খেলার আগে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। ঘোড়সওয়ারদের প্রদর্শনী, স্থানীয় শিল্পীদের নৃত্য, কৃষক ও শ্রমিকদের অংশগ্রহণ, ঐতিহ্যবাহী পোশাকের পরিবেশনা এবং এলাকার বিখ্যাত আপেল, খেজুর ও চেস্টনাট প্রদর্শনের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি ও কৃষিপণ্য তুলে ধরা হয়। বিরতির সময়ও ছিল শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমের উদ্বোধনী ম্যাচ ঘিরে প্রায় দুই লাখ ইউয়ান (প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার) সমপরিমাণ ভোক্তা ব্যয় হয়েছে। খেলার মাঠের পাশে বসানো অস্থায়ী বাজারে খাদ্য, কৃষিপণ্য ও স্থানীয় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। স্থানীয় এক রেস্তোরাঁ মালিক জানান, ম্যাচের দিন রাতের বাজারে দোকান বসিয়ে তিনি অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার ইউয়ান আয় করেছেন। যদিও কয়েকজন কৃষিপণ্য বিক্রেতা আগের বছরের তুলনায় বিক্রি কিছুটা কম হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

দর্শকদের কাছেও এই লিগের আকর্ষণ আলাদা। অনেকেই মনে করেন, বিশ্বকাপে চীনের জাতীয় দল না খেললেও নিজেদের এলাকার দলকে সমর্থন করার আনন্দ অন্যরকম। ২১ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রী বলেন, মাঠে এসে খেলা দেখা এবং নিজের এলাকার মানুষকে উৎসাহ দেয়ার অভিজ্ঞতা ঘরে বসে মোবাইলে আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত।

বিশ্লেষকদের মতে, ভিলেজ সুপার লিগের জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো পেশাদার ফুটবলের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা। গত কয়েক বছরে চীনের পেশাদার ফুটবলে আর্থিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং ম্যাচ পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগে বহু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। কয়েকটি শীর্ষ ক্লাবও আর্থিক সঙ্কটে বিলুপ্ত হয়েছে। এসব ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কিছুটা কমে গেলেও ভিলেজ সুপার লিগ আবার সেই আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

ফুপিং কাউন্টির ফাইনালে স্বাগতিক দল শেষ মুহূর্তে একমাত্র গোল করে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয়। ম্যাচ শেষে সমর্থকেরা মাঠে নেমে বিজয় উদযাপন করেন। পরাজিত বাওডিং দলের খেলোয়াড় ও পেশায় দন্তচিকিৎসক তুং জেহাও অবশ্য হতাশ হলেও আশাবাদ হারাননি। তিনি বলেন, জয়-পরাজয় খেলাধুলার স্বাভাবিক অংশ। এ বছর না পারলেও আগামী মৌসুমে আরো ভালো প্রস্তুতি নিয়ে ফিরে আসবে তার দল।

বিশ্বকাপের মঞ্চে চীনের উপস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। তবে ভিলেজ সুপার লিগ প্রমাণ করছে, ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক সাফল্যই সবকিছু নয়।