বহিষ্কারের পরও নারায়ণগঞ্জে ৫টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী : টালমাটাল বিএনপি
Printed Edition
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া, ধারাবাহিকতায় একের পর এক বহিষ্কার, কমিটি স্থগিত এবং দীর্ঘদিনের গ্রুপিং রাজনীতির প্রকাশ্য রূপ সংগঠনটিকে কার্যত টালমাটাল অবস্থায় ফেলেছে। এতে মাঠের রাজনীতির পাশাপাশি ভোটের সমীকরণ যেমন জটিল হয়ে উঠছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতি বিএনপি কিভাবে সামাল দেবে।
গত নভেম্বর মাসে প্রথম দফায় চারটি আসনে প্রার্থী দেয় বিএনপি। অপর আসনটি জোটের শরিক দলকে ছেড়ে দেয়। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের আগ পর্যন্ত মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কর্মকাণ্ড সহ্য করলেও পরে তাকে প্রশ্রয় দেয়নি দলটি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় একাধিক প্রভাবশালী নেতাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। তারপরও তারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করে বিদ্রোহী হওয়ায় বিদ্রোহীদের যারা সহযোগিতা করছেন তাদেরও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে দল। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দল জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে ছেড়ে দিলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো: শাহ আলম। তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পরদিনই তাদের বহিষ্কার করে বিএনপি।
গত ২১ জানুয়ারি বহিষ্কার হন সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম, সাবেক সংসদ সদস্য আতাউর রহমান আঙ্গুর এবং মো: দুলাল। রেজাউল করিম ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, আর আতাউর রহমান আঙ্গুর ও দুলাল হোসেন ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য। তারা তিনজনই দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হয়েছেন।
বিএনপি এই ধরনের বহিষ্কার শৃঙ্খলা রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বহিষ্কৃত নেতাদের অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রভাব ধরে রেখেছেন। এর প্রমাণ মিলেছে ২১ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে প্রতীক বরাদ্দের সময়ও। দলীয় প্রার্থীদের সাথে যেমন বিএনপি নেতা-কর্মীরা ছিলেন, তেমনি বিদ্রোহীদের সাথেও ছিলেন একাংশের নেতাকর্মীরা। যাদের অনেকেই স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী।
নির্বাচনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন ছাড়া বাকি চারটিতেই বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হতে হবে বিএনপি ও জোটের প্রার্থীদের। অন্তত দু’টি আসনে দু’জন বিদ্রোহী প্রার্থী লড়ছেন। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটিতে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে সামাল দিতে হচ্ছে গিয়াস উদ্দিন ও শাহ্ আলমের মতো প্রভাবশালী দুই বিএনপি নেতাকে। গিয়াস আসনটির সাবেক সংসদ সদস্য। ২০০১ সালে ধানের শীষ প্রতীকে আসনটি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও সাংগঠনিক ভিত্তির কারণে এখনো এলাকায় তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন।
অন্য দিকে শিল্পপতি মো: শাহ আলম বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে অংশ নিয়ে মাত্র আড়াই হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ওই নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে এখনো তার নিজস্ব ভোট-ব্যাংক সক্রিয় রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম। তিনি টানা চারবার বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় এমপি থাকার কারণে সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় তার শক্তিশালী কর্মী-সমর্থক ও ভোটার-ভিত্তি রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন গিয়াস উদ্দিন। ফলে এ আসনে আজহারুল ইসলাম মান্নানকে রেজাউলের পাশাপাশি গিয়াসকেও সামাল দিতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী আতাউর রহমান আঙ্গুর। তিনি পরপর তিনবার বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আড়াইহাজারের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব এখনো সক্রিয়।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক মো: দুলাল। ছাত্রদলের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা দুলালও আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে দলের ঐতিহ্যগত ভোট-ব্যাংক মারাত্মকভাবে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্যে ঐক্যের কথা বলা হলেও বাস্তবে তৃণমূলের কর্মীরা বিভ্রান্ত। দলীয় প্রার্থী নাকি বিদ্রোহী কাকে সমর্থন দিবেন এ নিয়ে দোটানায় আছেন মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকরা। কেননা, একেক নেতা একেকজনের পক্ষে কাজ করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির বর্তমান সঙ্কটের মূলেই রয়েছে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং। দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি ও বলয়কেন্দ্রিক রাজনীতিতে বিভক্ত দলটি নির্বাচনের মুখে এসে আরো স্পষ্টভাবে একাধিক গ্রুপে ভাগ হয়ে পড়েছে। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এই গ্রুপিং আরো তীব্র হয়েছে।
এই অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়বে নির্বাচনী সমীকরণে। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে বহিষ্কার, বিদ্রোহী প্রার্থী ও গ্রুপিংয়ের কারণে ভোট একত্রিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সাথে দশ দলীয় জোট ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি এই বিভক্তিকে নিজেদের রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে।