জেলায় জেলায় জ্বালানি সঙ্কট সীমান্তে কঠোর নজরদারিদ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি ও চড়া দামে তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে
- বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) খুচরা পর্যায়ে তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং দেশে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের মাঝে ‘যদি ফুরিয়ে যায়’ এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পার্শ্ববর্তী দেশে তেল পাচার রোধে সিলেট, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা ও সুনামগঞ্জ সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও তল্লাশি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
অন্য দিকে, সঙ্কটকে পুঁজি করে কোথাও কোথাও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি ও চড়া দামে তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) খুচরা পর্যায়ে তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
সিলেট ও রাজশাহী ব্যুরো, যশোরের অভয়নগর ও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর সংবাদদাতা জানান, সিলেটের পেট্রোল পাম্পগুলোতে গত শুক্রবার থেকে যানবাহনের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কায় অনেকেই আগেভাগে ট্যাংক পূর্ণ করে রাখতে চাইছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিপিসি নির্দেশ দিয়েছে যে, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ দুই লিটার এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ১০ লিটার তেল নিতে পারবে। এ ছাড়া বড় যানবাহনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে।
নগরীর আম্বরখানা ও পাঠানটুলা এলাকার পাম্পগুলোতে দেখা গেছে, চালকরা বেশি তেল চাইলেও পাম্প কর্তৃপক্ষ ২০০-৩০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না। সিলেট বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম আদনান জানান, মজুদ পর্যাপ্ত থাকলেও আতঙ্কিত হয়ে সবাই এক সাথে তেল নিতে আসায় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ছে। রোববারের আগে ডিপো বন্ধ থাকায় সাময়িক রেশনিং করতে হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলে সঙ্কটের নেপথ্যে ‘ডাবল’ দুর্ভোগ
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর ও নিকলীসহ হাওরাঞ্চলে ডিজেল সঙ্কটে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে হাওর অঞ্চালের জমি সেচ প্রকল্পের আওতায় হওয়ায় এ দুর্ভোগ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সেচ পাম্প চালানোর জন্য ডিজেল অপরিহার্য। তেলের চাহিদা থাকায় ক্রেতারা দোখানে লাইন ধরে ভিড় করছেন। এ সুযোগে অসাদু ব্যবসায়ীরা খুচরা বাজারে লিটার প্রতি ১৫ থেকে ৩০ টাকা অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকরা জানান, ১২০ থেকে ১৩০ টাকা লিটার দরেও ঠিক মতো তেল মিলছে না। এক দিকে বৃষ্টি কম হওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে, অন্য দিকে ডিজেলের দুষ্প্রাপ্যতা; এই দুই সঙ্কটে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। জেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
রাজশাহী ও অভয়নগরে কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ
রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় পেট্রোল ও অকটেনের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিভাগের ২৭৯টি ফিলিং স্টেশনের অনেকগুলোই তেল না থাকায় সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলোতে তেল আছে, সেখানে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদা মতো তেল পাচ্ছেন না চালকরা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহী বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল বলেন, সরবরাহ সঙ্কটের কারণে পাম্পগুলো অসহায় হয়ে পড়েছে।
যশোরের অভয়নগরে পাম্পগুলোতে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুললেও স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি অসাধু সিন্ডিকেট তেল মজুদ করে রাতে বা পরিচিতদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছে। নওয়াপাড়ার মাহেন্দ্র ও অটোরিকশা চালকরা তেল না পেয়ে রাস্তায় গাড়ি নামাতে পারছেন না। অভয়নগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশীষ কুমার বসু জানিয়েছেন, কৃত্রিম সঙ্কট রোধে খুব দ্রুতই পাম্পগুলোতে তদারকি ও অভিযান চালানো হবে।
সীমান্তে বিজিবির বিশেষ সতর্কতা ও নজরদারি
জ্বালানি তেল পাচার রোধে সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তেও ২৮ বিজিবি পাথর ও কয়লাবাহী ট্রাকগুলোতে বিশেষ তল্লাশি চালাচ্ছে।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, তেলের অস্থিতিশীলতার প্রভাব মোকাবেলায় সাতক্ষীরা সীমান্তে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিবি। গতকাল শনিবার বিজিবি ৩৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার ও অপব্যবহার রোধে বিশেষ নজরদারি এবং তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।
বিজিবি জানায়, অনেক সময় বিদেশী কার্গো যানবাহন কম জ্বালানি নিয়ে প্রবেশ করে স্থানীয় পাম্প থেকে ট্যাংক পূর্ণ করে চলে যায়। আবার দেশীয় ট্রাকগুলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল নিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে। এসব অনিয়ম বন্ধে ভোমরা স্থলবন্দরসহ সদর ও কলারোয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি পয়েন্টে বিশেষ চেকপোস্ট ও মোবাইল টহল বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ভোমরা, ঝাওডাঙ্গা ও সুলতানপুর বিওপিসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাচার রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতা কামনা করেছে বিজিবি।
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, বাজারের অস্থিরতাকে পুঁজি করে তেল পাচার রোধে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি। গত শুক্রবার সকাল থেকে উপজেলার তিনটি শুল্ক বন্দরসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। বিজিবি জানায়, অসাধু চক্র অধিক মুনাফার আশায় সীমান্ত দিয়ে গোপনে তেল পাচারের চেষ্টা করছে। এ কারণে এলসি পয়েন্টগুলোতে বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে সন্দেহভাজন পরিবহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে পাথর ও কয়লাবাহী বড় ট্রাকগুলো আনলোড করে ফেরার সময় যাতে অবৈধভাবে তেল নিয়ে যেতে না পারে, সে দিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। সম্ভাব্য পাচার রুটগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা ও বিশেষ টহল বাড়ানো হয়েছে। বিজিবি অধিনায়ক বলেন, জ্বালানি তেলের মজুদ সুরক্ষা এবং পাচারের ঝুঁকি এড়াতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি ও দামুড়হুদা সংবাদদাতা জানান, পেট্রোল পাম্পগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পাম্প কর্তৃপক্ষ তেল বিক্রি সীমিত ঘোষণা করেছে। পাম্প স্টেশনে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে আগে যেখানে দিনে পাঁচ হাজার লিটার তেল বিক্রি হতো, সেখানে বর্তমানে দিনে দ্বিগুণ তথা দশ হাজার লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে। তেলের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি ও পাচার রোধে চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। ঢাকা সদর দফতরের নির্দেশনায় চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়ন (৬ বিজিবি) তাদের দায়িত্বপূর্ণ দর্শনা আইসিপিসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন ও টহল জোরদার করেছে।
বিজিবি জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় অসাধু চক্রের পাচারের চেষ্টা রুখতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে অতীতে যেসব পথ দিয়ে ডিজেল ও পেট্রোল পাচারের ইতিহাস রয়েছে, সেই পয়েন্টগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দর্শনা আইসিপি দিয়ে যাতায়াতকারী পণ্যবাহী ট্রাকগুলোতেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, দেশের জ্বালানি সম্পদ সুরক্ষায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে কোনোভাবেই যাতে তেল পাচার হতে না পারে।
প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক দূর করতে না পারলে এই কৃত্রিম সঙ্কট আরো ঘনীভূত হতে পারে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলোতে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এখন সময়ের দাবি।