পুলিশ সংস্কারে চশমা বদল নাকি খোলস পরিবর্তন?

জুলাই বিপ্লবের দুই বছর

এস এম মিন্টু
Printed Edition

  • সংস্কারের প্রথম শর্তই ছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা : সাবেক আইজিপি বাহারুল
  • বল প্রয়োগের মধ্যে সংস্কার এভাবেই চলবে পুলিশ : সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশকে ‘জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক’ বাহিনীতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় দুই বছর পার হলেও মাঠপর্যায়ে পুলিশের চরিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন কতটা এসেছে, এই প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ আর বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে স্পষ্ট সংশয় তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, পুলিশ সংস্কারের লক্ষ্য হলো পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জনবান্ধব এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা। এর মূল উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরাধ দমন, নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ এবং বাহিনীর ভেতর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু পুলিশ সেই আগের অবস্থানেই বহাল রয়েছে।

তাদের মতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন-পরবর্তী পুলিশ সংস্কারের মূল চ্যালেঞ্জ কাঠামোগত আইন প্রণয়ন নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। ফ্যাসিবাদী আমলে পুলিশের যে দলীয়করণ ও জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা থেকে বাহিনীকে মুক্ত করতে কেবল নেতৃত্ব বদল বা বদলি আদেশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা, যা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুলিশই তদন্ত করার সাংঘর্ষিক চক্র থেকে বের করে আনবে। গত ১৮ জুন আইজিপির সাক্ষরিত আদেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১২ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে। এ ধরনের আদেশ চলমান থাকলেও, বদলি-পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় যোগ্যতা-ভিত্তিক স্বচ্ছ মূল্যায়ন কতটা কাজ করছে তা নিয়ে পুলিশের অভ্যন্তরেই প্রশ্ন রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর ঢাকায় ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এমন শঙ্কা থেকে পাশাপাশি বিজিবি ও সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামানো হয়। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা না করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেন মাঠে নামানো হচ্ছে। কয়েকজন পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘুরে ফিরে সেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুলিশকেই ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ আক্রান্ত হলে পরিবারের দায়িত্ব কি সরকার নিবে? তাদের অভিযোগ পুলিশ সংস্কারের যে শর্তগুলো ছিল তা বাস্তবায়ন না করে সেই পুলিশকে দিয়েই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের চেষ্টা করতে চাইছে সরকার। তারা বলছেন, রাজনৈতিক মাঠে রাজনৈতিকভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে নামিয়ে এর সমাধান হবে না।

রূপান্তর নাকি পুনরাবৃত্তি?

পুলিশ সংস্কারের বিষয়ে অনেকেই বলেছেন পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বল প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ, স্বাধীন পুলিশ কমিশন, নিয়োগ-পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা এগুলো কাগজে-কলমে আটকে আছে। বাস্তবায়নের গতি ধীর, বড় সংস্কারগুলো রাজনৈতিক ঐকমত্যের অপেক্ষায় ঝুলে আছে এবং তদবির-বাণিজ্য ও হেফাজতে নির্যাতনের মতো পুরনো প্রবণতা থেমে নেই- বরং তা মন্ত্রণালয় পর্যায়েও প্রবেশ করেছে। শাস্তি যখন বদলিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, পুলিশ সংস্কারের নামে যা ঘটছে তা প্রকৃত গুণগত রূপান্তর নাকি কেবল চশমা বদলে পুরনো খোলসটাই টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়া?

কমিশনের সুপারিশ কাগজে বিস্তর, প্রয়োগে সীমিত

পুলিশ সংস্কার কমিশন তার প্রতিবেদনে বাহিনীর মধ্যে দুর্নীতির নিয়োগ ও বদলি-বাণিজ্যকে অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উল্লেখ করেছে যে কনস্টেবল নিয়োগে দশ লাখ টাকা বা তার বেশি ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মোট ৯টি খাতে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে কমিশন এই দুর্নীতি নির্মূলে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণে আরো এসেছে, পুলিশের একাংশ অপরাধীদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে এবং বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ নেয়া, মাদক, মানব পাচার ও অস্ত্র ব্যবসার সাথেও এই যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে।

কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাবেও কমিশন স্পষ্ট। বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে, যার অধীনে থাকবে একটি পর্যালোচনা কমিটি এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য। জনমত জরিপে অংশ নেয়া মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এক পরিসংখ্যান উঠে এসেছে প্রায় ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন, যা জনগণের আস্থার সঙ্কট কতটা গভীর তা প্রমাণ করে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাম্প্রতিক বৈঠকে পাঁচটি সংস্কার কমিশনের মোট ১২১টি আশু বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবের মধ্যে পুলিশ সংস্কার কমিশনের ১৩টি প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাছাই করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের মতো বড় কাঠামোগত সংস্কার এখনো জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার টেবিলে আটকে আছে।

তদবির করলেই বাতিলের নির্দেশ আছে, প্রয়োগ কতটা?

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্পষ্ট বার্তা দেয়া হয়- পুলিশে লোভনীয় পদে তদবির করা হলে তা বাতিল করা হবে। তবে একই সময়ে আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র‌্যাব মহাপরিচালকের পদে পরিবর্তনের গুঞ্জনের মধ্যেই শীর্ষ পদের জন্য রাজনৈতিক মহলে জোর লবিং শুরু হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়। এমনকি অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয়, নির্দেশনা ও মাঠের চিত্রের মধ্যে এখনো সেতু তৈরি হয়নি।

বাস্তব ঘটনাও এই সংশয়কে জোরদার করে। গত মে মাসে রাজধানীর রামপুরা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ এমন একটি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতার করে। যারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আদায় করছিল। তদন্তে উদ্বেগজনক তথ্য মিলেছে অভিযুক্তদের একজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই কর্মচারী ছিলেন এবং তাদের ডিজিটাল ডিভাইস থেকে বদলি-পদায়ন নিয়ে কথোপকথন ও কর্মকর্তাদের বায়োডাটা আদান-প্রদানের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর কিছুদিন আগে পুলিশে চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগে আরো দু’জনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। যারা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া প্রার্থীদের কাছ থেকে প্রভাবশালী মহলের সাথে যোগসাজশের মিথ্যা দাবি করে অর্থ আদায় করত। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, বদলি-বাণিজ্যের চক্র এখন পুলিশের অভ্যন্তরীণ সীমা ছাড়িয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সংগঠিত অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে।

জবাবদিহির বদলে বদলি ও হেফাজতে নির্যাতনের দুই ঘটনা

দলীয়করণমুক্তির প্রতিশ্রুতির পরও থানা পর্যায়ে নির্যাতনের অভিযোগ থেমে নেই। গত নভেম্বরে নেত্রকোনা সদর থানায় রিমান্ডে থাকা এক আসামিকে হাত-পা-চোখ বেঁধে থানার পুলিশ কোয়ার্টারে নিয়ে ঝুলিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। যার সত্যতা মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের অনুসন্ধানে নিশ্চিত করে। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, এ ঘটনা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর সরাসরি লঙ্ঘন। ডিসেম্বরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানাতেও পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এ ছাড়াও পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, নির্যাতন, আটক করে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের মতো অভিযোগের মাত্রা বেড়েই চলেছে। কিন্তু প্রমাণিত হলেও শাস্তি প্রায়ই প্রত্যাহার, সাময়িক বরখাস্ত বা স্রেফ বদলিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ, একজন অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে এক থানা থেকে আরেক থানায় সরিয়ে দেয়াই যেন সর্বোচ্চ জবাবদিহি প্রকৃত বিচার বা স্থায়ী শাস্তি বিরল। সিলেটে ২০২০ সালে পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় এসআই আকবরসহ একাধিক পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত-প্রত্যাহার করা হলেও মূল অভিযুক্তের বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি। এই বিলম্বই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিহীনতার একটি দীর্ঘস্থায়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক পুলিশের মহপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা প্রথম থেকে বলে আসছি পুলিশ সংস্কারের প্রথম শর্তই ছিল পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা, মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব না দেখানো। এসপি বদলির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া। এই কয়টা বিষয় সংস্কার হলেই পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে এর পরিবর্তন দেখছিনা। যা হচ্ছে সবই রাজনৈতিক প্রভাব থেকেই। আমরা যেসব প্রস্তাব করেছিলাম তা সংস্কারের কোনো আলামত দেখছি না।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূরুল হুদা বলেন, যেভাবেই চলছে এর মধ্যেই পুলিশ রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের পাশাপাশি সংস্কার চলতে থাকবে। পুলিশ আগের তুলনায় অনেক চাঙ্গা। আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং রাজনৈতিক চাপের বিষয়ে তিনি বলেন এভাবেই চলতে থাকবে।