কক্সবাজারে গ্যাসস্টেশনের আগুনে দগ্ধ ১৬, পুড়েছে বাড়িসহ ২৫ গাড়ি

ছিল না ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশের ছাড়পত্র তদন্ত কমিটি গঠন

Printed Edition

কক্সবাজার অফিস

উদ্বোধনের এক দিন পরই বুধবার রাতে কক্সবাজারের কলাতলীতে নির্মিত ‘কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন’ নামে গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনায় আগুনে অন্তত ১৬ জন দগ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ছয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আগুনে ফিলিংস্টেশনটি ছাড়াও আশপাশের অন্তত ১০টি বসতবাড়ি-প্রতিষ্ঠান ও ২৫টির বেশি গাড়ি পুড়ে গেছে। নির্মিত গ্যাসপাম্পটির ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশের কোনো ছাড়পত্র ছিল না বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

বুধবার রাত ২টার দিকে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, রেড ক্রিসেন্ট এবং স্থানীয়দের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ৫ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও এর মধ্যে অন্তত ১০টি বাড়ি ও পর্যটক পরিবহনের ২০টি জিপ গাড়িসহ অন্যান্য যানবাহন তিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন তির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

এর আগে সন্ধ্যা ৭টার দিকে গ্যাস পাম্পটি থেকে গ্যাস লিকেজ শুরু হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার পর রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ধরে যায়। বিস্ফোরণের পর পরই পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১৪ হাজার লিটার ধারণমতার গ্যাস ট্যাঙ্কে থাকা গ্যাস সম্পূর্ণ নিঃশেষ হলে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।

এ দিকে গতকাল সকালে পাম্পটি পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (এডিএম) নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ মধ্যরাতে সাংবাদিকদের জানান, ফিলিংস্টেশনটির অনুমোদন ছিল না, গ্যাস লিকেজের কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে। আগুনে ফিলিংস্টেশনটি ছাড়াও আশপাশের অন্তত ১০টি বসতবাড়ি ও ২০-২৫টি গাড়ি পুড়েছে। ফিলিংস্টেশনটির মালিক পরে বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, গ্যাসের ফুটো থেকে বিস্ফোরণ ও আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি গ্যাস ফুটো বন্ধে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সবুক্তাগিন মাহমুদ সোহেল বলেন, আহতদের মধ্যে ছয়জনকে জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের ঢাকা ও চট্টগ্রামে রেফার করা হয়েছে।

কক্সবাজার শহরের বাইপাস সড়কের এই গ্যাস পাম্পটি গত মঙ্গলবার উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনের পরদিন বুধবার রাতে পাইপ লাইন ফুটো হয়ে সেখানে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়া সতর্কতা না মেনে জনবহুল স্থানে এটি চালু করা হয়েছিল। ফলে অনাকাক্সিত দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি।

তবে কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন নামে গ্যাসপাম্পটির মালিক রামুর বাসিন্দা এন আলম দাবি করেছেন, পাম্পের ছাড়পত্র আছে। তদন্ত কমিটির কাছে কাগজপত্র যথাসময়ে উপস্থাপন করবেন তিনি। ব্যবসা-বাণিজ্য থাকলে দুর্ঘটনা ঘটবে উল্লেখ করে এন আলম আরো বলেন, আগুনে যারা দগ্ধ বা তিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পাশে আছেন তিনি।

দগ্ধদের মধ্যে চট্টগ্রামে মেডিক্যালে ভর্তি হওয়া ছয়জন হলেন, আদর্শগ্রামের বাসিন্দা আবু তাহের, মো: সিরাজ, আবদুর রহিম, মো: সাকিব, মোতাহের হোসেন ও আবুল কাশেম। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ছয়জন রোগীর শরীরের ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পুড়েছে। সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের জনবহুল এলাকায় ওই গ্যাসপাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাম্পটির আশপাশে আদর্শগ্রাম, চন্দ্রিমা হাউজিং ও পুলিশ লাইনস এলাকায় অন্তত ২০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাসপাম্প স্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশ কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো: আ: মান্নান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, গ্যাসপাম্প নির্মাণ, আগুনের সূত্রপাত এবং য়তি নিরূপণ করতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলে বলা যাবে গ্যাসপাম্পটি কিভাবে তৈরি হলো।

যেভাবে বিস্ফোরণ, আগুন : শহরের কলাতলীর হোটেল মোটেল জোনের পূর্ব দিকে বাইপাস সড়কের আদর্শগ্রামে (চন্দ্রিমা হাউজিংয়ে প্রবেশের মুখে) নির্মিত হয় গ্যাস পাম্পটি। বুধবার সন্ধ্যায় পাম্পের ট্যাংক থেকে ফুটো দিয়ে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন ধরে যায়। পাম্পের কর্মচারীরা বালু ও পানি ছিটিয়ে তা নেভান। পরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আবার আগুন ধরে যায়। সেই আগুন চার দিকে ছড়াতে থাকে। এ ঘটনায় গ্যাসপাম্পের পাশে থাকা একটি গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে রাখা অন্তত ২৫টি গাড়ি পুড়ে গেছে। গাড়িগুলো গ্যারেজে মেরামতের জন্য রাখা হয়েছিল। গ্যারেজের কর্মচারী নুরুল আলম বলেন, পাম্প থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে একে একে ২৫টির বেশি প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও পর্যটক বহনের খোলা জিপ পুড়ে গেছে। একটি জিপ গাড়ির মালিক শামসুদ্দীন বলেন, ৮ লাখ টাকা খরচ করে তিনি পর্যটক পরিবহনের জন্য জিপ গাড়িটি তৈরি করে পার্কিংয়ে রাখেন। আগামী ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এই গাড়ি চালানোর কথা ছিল। কিন্তু মধ্যরাতের আগুনে তার জিপসহ অনেকগুলো জিপ গাড়ি পুড়ে ছাই হলো।

পাম্প বন্ধ ও সরানোর দাবি : গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গ্যাসপাম্প এলাকায় জড়ো হতে থাকেন পরিবেশ কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। তারা ব্যস্ততম একটি সড়কের পাশে জনবহুল এলাকা থেকে ওই গ্যাস পাম্পটি উচ্ছেদের দাবি জানান।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরণ পরিষদ সভাপতি দীপক শর্মা এ বিষয়ে বলেন, পাম্প নির্মাণের বিপরীতে মালিকপ পরিবেশ ছাড়পত্র নেননি বলে জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদনও নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে পাম্পটি সরিয়ে না নিলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। তার কাছেও স্থানীয় লোকজন পাম্পের গ্যাস বিক্রি বন্ধ ও তা অন্যত্র সরিয়ে দেয়ার দাবি জানান।

বেলা ১১টার দিকে গ্যাসপাম্প পরিদর্শন করেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান খান। ঘটনাস্থলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন নামে গ্যাসপাম্পে রাতে ফুটো থেকে দুর্ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসন আগুন নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, গ্যাসপাম্পটির বৈধ অনুমোদন নেই বলে শোনা গেছে, তদন্তে তা বেরিয়ে আসবে। আমরা মালিকপকে এখানে (পাম্পে) দেখছি না। তাদের বক্তব্য শোনা দরকার, কাগজপত্র পরীা-নিরীা করা দরকার।

পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, গ্যাসপাম্প নির্মাণের বিপরীতে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেয়া হয়েছিল কি না, এই মুহূর্তে তার মনে পড়ছে না। তিনি ঢাকাতে অবস্থান করছেন। তবে ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন না থাকলে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রও থাকার কথা নয়।