দাউর মানুষ : লোপা জয়নুল আবেদীন

Printed Edition
nittodin-1
দাউর মানুষ : লোপা জয়নুল আবেদীন

এ জাতির পুরুষেরা গ্রীষ্মে তৃণটুপি পরে আর শীতকালে পরে চামড়ার কানঢাকা টুপি। নারীরা গ্রীষ্মকালে সাদা কাপড়ের মোজা এবং ফুলেল নকশার জুতা পরে। শীতকালে এরা চামড়ার জুতা এবং নীল সুতির গাউন পরে। বিয়ের সময় কিংবা আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার সময় এরা হাতাছাড়া জ্যাকেট পরে যার ভেতরের অংশ আবৃত করা হয় নেউল, কাঠবিড়াল কিংবা চিতাবাঘের লোম দিয়ে। এ সময় এদের কাঁধে ঝুলানো থাকে একটি ছোট্ট হাতব্যাগ। বলছি চীনের একটি নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ‘দাউর’ মানুষের কথা।

এরা প্রধানত বাস করে অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া স্বশাসিত অঞ্চল এবং হেইলংজিয়াং প্রদেশে। এ ছাড়া জিনজিয়াং উইঘুর স্বশাসিত অঞ্চলের ত্যাচেং এলাকায়ও এদের দেখা যায়। দাউর সম্প্রদায়ের বেশিরভাগের বসবাস মোরিন দাওয়া দাউর স্বশাসিত জেলায়। এটি হেইলংজিয়াংয়ের নেনজিয়াং নদীর বাম তীরে অবস্থিত। এ জেলার (ব্যানার) আয়তন প্রায় ১১ হাজার ৯৪৩ বর্গকিলোমিটার। এখানে রয়েছে তৃণভূমি এবং কৃষিজমি। ভুট্টা, জোয়ার, সয়াবিন ও ধান এখানকার প্রধান ফসল। বিভিন্ন শাকসবজিও উৎপন্ন হয়। মোরিন দাওয়ার উত্তরে ওক, ভুর্জ, এল্্ম্ (দেবদারুজাতীয় গাছ) ইত্যাদি গাছ পাওয়া যায়। এখানকার জঙ্গলে রয়েছে ভালুক, হরিণ, ক্ষুদ্র লেজের বিড়াল ও ভোঁদর। দাউরদের ভূমিতে স্বর্ণ, অভ্র, লোহা ও কয়লা রয়েছে।

দাউররা সংখ্যায় প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার। এরা শ্যামানিবাদ ও তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করে।

দাউররা কথা বলে দাউর ভাষায়। এ ভাষার সাথে মঙ্গোলিয়ান ভাষার সাদৃশ্য রয়েছে। অনেক দাউর বহুভাষী। বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সাথে মিলেমিশে বাস করার ফলে এরা সহজেই রপ্ত করে হ্যান, মঙ্গোলিয়ান, উইঘুর, কাজাখ, এউয়েনকি বা অরকুয়েন ভাষা। কিং রাজবংশের আমলে (১৬৪৪-১৯১১) দাউররা লিখিত ভাষা হিসেবে মাঞ্চু ব্যবহার করত। ১৯১১ সালের চীনা বিপ্লবের পর মাঞ্চুর স্থান দখল করেছে ম্যান্ডারিন চীনা ভাষা। বেশিরভাগ দাউর কৃষিজীবী। পশুপালন, শিকার ও মাছ ধরাও এদের জীবিকা। সাহিত্য-সংস্কৃতিতে দাউরদের ঐতিহ্য রয়েছে। দাউর লোকসাহিত্য গড়ে উঠেছে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণকে ভিত্তি করে, কিন্তু এতে লোককাহিনী ও রূপকথাও রয়েছে। শাসকের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাউর জনগণের সংগ্রামও দাউর সাহিত্যে প্রতিফলিত। দাউরদের দৈনন্দিন বিশেষ খাদ্যতালিকায় রয়েছে জনারি বা বাজরার নুডল্স যা দুধ মিশ্রিত করা হয়, বাজরার পিঠা এবং জইয়ের পিঠা যা পানি বা দুধে সিদ্ধ করে তৈরি করা হয়। দাউররা হরিণের গোশত, ফিজন্ট (একধরনের পাখি) ও পাতিহাঁস খেতে পছন্দ করে।

এরা মৃতদেহ কবর দেয়। মৃতদেহের সাথে অলঙ্কার, তামাকের নল, রান্নার বাসন এবং অনেক সময় ঘোড়া হত্যা করে কবর দেয়। ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের পর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পক্ষেত্রে দাউররা অনেক এগিয়ে গেছে। কৃষিক্ষেত্রে এরা আগে থেকেই উন্নত। এ ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক আমলে আরো বেশি উন্নতি করেছে। দাউর সমাজে এক বিয়ে প্রচলিত।