মির্জাগঞ্জে পানের বরজে ফিরছে স্বপ্ন লাভের আশায় বাড়ছে কৃষকের ঝোঁক

Printed Edition
bangla-3
মির্জাগঞ্জে পানের বরজে ফিরছে স্বপ্ন লাভের আশায় বাড়ছে কৃষকের ঝোঁক

উত্তম গোলদার মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী)

একসময় স্থানীয় চাহিদা মেটাতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পান কিনে আনতে হতো। এখন সেই মির্জাগঞ্জেই বিস্তৃত হচ্ছে একের পর এক পানের বরজ। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, বাজারে চাহিদা স্থিতিশীল এবং সঠিক পরিচর্যায় দীর্ঘমেয়াদি ফলন, এই তিন বাস্তবতায় পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় পান চাষ ধীরে ধীরে কৃষকদের কাছে সম্ভাবনাময় বিকল্প কৃষিতে পরিণত হচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, পতিত বা কম ব্যবহার হওয়া জমিতে কৃষকরা নতুন করে পানের বরজ গড়ে তুলছেন। চারদিকে পাটখড়ি ও নেটের বেড়া, ভেতরে সারিবদ্ধ পাটকাঠি জড়িয়ে উঠেছে সবুজ পানের লতা। বরজে পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই দমনে কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। দৃশ্যত বোঝা যায়, এটি শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, অনেকের কাছে এটি ভাগ্য বদলের চাষ।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মির্জাগঞ্জে প্রায় ১১৫ একর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে কাকড়াবুনিয়া, আমড়াগাছিয়া ও মজিদবাড়িয়ায় এর বিস্তার বেশি হলেও এখন কমবেশি সব ইউনিয়নেই পান চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ, সুষম সার প্রয়োগ এবং বাজারে লাভজনক মূল্য কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

পশ্চিম কাকড়াবুনিয়া গ্রামের কৃষক ঝন্টু ভক্ত ৩৫ শতাংশ পতিত জমিতে পান চাষ করে নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে তিনি বলেন, ‘পান চাষে লাভ আছে, কিন্তু ঝুঁকিও কম না। ঝড়, অতিবৃষ্টি বা শীতের কুয়াশা বড় ক্ষতি করে দেয়। তারপরও ধৈর্য ধরে টিকে থাকলে ভালো আয় সম্ভব।

আসলে পান চাষের এই খাতটি সম্ভাবনার পাশাপাশি সংবেদনশীলও। একবার বরজ তৈরি হলে বছরের পর বছর পাতা তোলা যায়, কিন্তু আবহাওয়ার সামান্য বিরূপ প্রভাবেও উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে শীত ও ঘন কুয়াশার সময় চাষিদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। এজন্য বরজ ঘিরে পাটখড়ি ও নেট ব্যবহার করে কুয়াশা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হয়, যা অতিরিক্ত শ্রম ও যতœ দাবি করে।

মির্জাগঞ্জের সুবিদখালী বাজারে ভোর থেকেই বসে পানের বড় পাইকারি মোকাম। এখানকার সতেজ পান স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিষ্টি পানের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে বড় আকারের উন্নত বা হাইব্রিড জাতের পানের দাম বেশি পাওয়া যায়। ফলে অনেক কৃষক এখন বাজারমুখী জাতের দিকে ঝুঁকছেন।

মির্জাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, পান চাষে খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা আগ্রহী হচ্ছেন। চলতি মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বড় প্রভাব না থাকায় বরজের অবস্থা ভালো। কৃষকদের সার, খৈল, স্প্রে ও পরিচর্যা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

তবে কৃষি বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাবনাময় খাতকে আরো টেকসই করতে সরকারি প্রণোদনা, সহজ ঋণ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা জরুরি। কারণ ব্যক্তিগত শ্রমে গড়ে ওঠা পানের বরজ এখন মির্জাগঞ্জের বহু কৃষকের কাছে কেবল চাষ নয়- গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন আশার নাম।