স্যাগ্রহণ ১৭ ফেব্রুয়ারি
ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ নেতার বিরুদ্ধে বিচার শুরু
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন।
প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। মামলার সূচনা বক্তব্য ও স্যাগ্রহণের জন্য আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে। শুনানি চলাকালে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবীরা দাবি করেন, ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং যথাযথ তথ্যপ্রমাণ নেই। তারা আসামিদের অব্যাহতি দেয়ার আবেদন জানান। তবে প্রসিকিউশন প ওবায়দুল কাদেরের সুনির্দিষ্ট তিনটি ‘কাউন্ট’ বা অভিযোগ এবং অডিও রেকর্ড ও ভিডিওর তথ্য উপস্থাপন করলে আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে চার্জ গঠন করেন।
মামলার সাত আসামিই পলাতক। তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার চলবে। অভিযুক্তরা হলেন ১. ওবায়দুল কাদের (সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ) ২. আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগ) ৩. মোহাম্মদ আলী আরাফাত (সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী) ৪. শেখ ফজলে শামস পরশ (সভাপতি, যুবলীগ) ৫. মাইনুল হোসেন খান নিখিল (সাধারণ সম্পাদক, যুবলীগ) ৬. সাদ্দাম হোসেন (নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি) ৭. শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান (নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক)।
প্রসিকিউশন ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দায় ও নেতৃত্বের দায় মিলিয়ে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার ওপর জোর দিয়েছে। কাউন্ট-১ (সরাসরি হত্যার নির্দেশ): ১১ জুলাই ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করার সরাসরি নির্দেশ এবং ১৫ জুলাই ‘রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ’ বলে উসকানি প্রদান। যার ফলে ১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিহত হন।
কাউন্ট-২ (শ্যুট অ্যাট সাইট ও হেলিকপ্টার হামলা): ১৮ ও ১৯ জুলাই ওবায়দুল কাদের ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ জারি করেন। একই সময়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগ করে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়া এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় আগুন দিয়ে এর দায় আন্দোলনকারীদের ওপর চাপানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
কাউন্ট-৩ (চূড়ান্ত গণহত্যা): ৩ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায় দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও মিরপুরসহ সারা দেশে ব্যাপক গণহত্যা সংগঠিত করার নির্দেশ। প্রসিকিউশনের তথ্যমতে, এসব নির্দেশে ১৪০০-এর বেশি ছাত্র-জনতা শহীদ হন।
গত ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের প থেকে এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে বিচার শুরুর এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আসামিপে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী লোকমান হাওলাদার ও ইশরাত জাহান শুনানিতে দাবি করেন, তাদের মক্কেলদের সাথে এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি বা সম্পৃক্ততা নেই। যথাযথ তথ্যপ্রমাণের অভাবের কথা উল্লেখ করে তারা আসামিদের মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছিলেন। তবে ট্রাইব্যুনাল উভয় পরে যুক্তি-তর্ক বিবেচনা করে অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে দেন ও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় বিচার শুরুর আদেশ প্রদান করেন।
জাহাজবাড়িতে জঙ্গি নাটক, ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন : এদিকে রাজধানীর মিরপুরের জাহাজবাড়িতে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নয় তরুণ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকসহ ৭ আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে আরো দুই সপ্তাহ সময় পেয়েছে প্রসিকিউশন। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেছে ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। প্রসিকিউশনের পে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম। তিনি এ মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে আরো দুই সপ্তাহ সময় চান। পরে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল। এদিন সকালে এ মামলায় সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হকসহ সাবেক তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্যরা হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো: আসাদুজ্জামান মিয়া ও ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) মো: জসীম উদ্দীন মোল্লা।
২০১৬ সালের ২৫ জুলাই গভীর রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত একটি বাড়িতে কথিত জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। ‘অপারেশন স্ট্রম-২৬’ নামের ওই অভিযানে ৯ যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়।
দাউদকান্দির সাবেক চেয়ারম্যান সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুমিল্লার দাউদকান্দিতে হত্যাকাণ্ডের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মেজর (অব:) মোহাম্মদ আলী সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তিনি মামলার অগ্রগতি তুলে ধরার পাশাপাশি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরো দুই মাস সময়ের আবেদন করেন। এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি চাওয়া হয়। পরে তার আবেদন মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৯ মার্চ ও ১৫ দিনের মধ্যে সুবিধাজনক সময়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়া হয়।
এদিকে সকালে মোহাম্মদ আলী সুমনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। এর আগে, ১৪ ডিসেম্বর এ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে হাজিরের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশন জানায়, ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট দাউদকান্দিতে নিরস্ত্র আন্দোলনকারী মো: রিফাত হোসেন ও মো: বাবুকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া আরো অনেকে আহত হন। এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান সুমনের বিরুদ্ধে। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মেজর জেনারেল (অব:) সুবিদ আলী ভূঁইয়ার ছেলে। দাউদকান্দি মডেল থানায় হওয়া দু’টি মামলায় চলতি বছরের ৬ অক্টোবর গ্রেফতার হন মোহাম্মদ আলী সুমন।