শহীদ পরিবারের আর্তনাদে কাঁদলেন তারেক রহমান

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে ব্যর্থ হলে শোকসভা চলতেই থাকবে

Printed Edition
first-3
তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

একটি নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতেও শোকগাথা আর শোক সমাবেশ চলতে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণ-অভ্যুত্থানে যারা শহীদ ও হতাহত হয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হই, তা হলে এভাবেই আমাদের শোকগাথা আর শোক সমাবেশ করতে হবে। তাই গণতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর খামারবাড়ি এলাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর সাথে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তারেক রহমান।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এ সময় মঞ্চের সামনে জুলাই হতাহত পরিবারের সাথে অতিথি সারিতে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা: জোবাইদা রহমান।

মঞ্চে যখন একের পর এক শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের স্বজন হারানোর আর্তি জানাচ্ছিলেন, তখন পুরো মিলনায়তনের অন্যরকম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। উপস্থিত সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। বাদ যাননি তারেক রহমানও। বারবার চোখের পানি মুছছিলেন তিনি। শহীদ পরিবারের সদস্যরা নিজেদের বেদনা ও কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তারেক রহমান মঞ্চের আসন ছেড়ে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে গিয়ে তাদের সান্ত¡না দেন এবং কথা বলেন। কয়েকজন শহীদের মা কাঁদতে কাঁদতে মঞ্চের দিকে এগুলে, তারেক রহমান মঞ্চে হাঁটু গেড়ে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেন। পাশাপাশি জোবাইদা রহমানও শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে গিয়ে সমবেদনা জানান। তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন এবং ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ এবং আহতদের ব্যাপারে রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সেই দায়িত্ব অনুভব করে। জনগণের রায়ে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে অবশ্যই আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করব।

বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, দল বা কোনো গোষ্ঠীর নয়। এই আন্দোলন ছিল সত্যিকার অর্থে অধিকারহারা গণতন্ত্রকামী মানুষের গণ-আন্দোলন। ২০২৪-এর অর্জনকে সুসংহত করতে চাইলে দেশের নারী-পুরুষ সবার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন।

তারেক রহমান বলেন, যারা স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনকে দলীয় স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে পরিণত করতে চায়, তাদের সম্পর্কে স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষকে অবশ্যই সজাগ থাকা জরুরি। ২০১৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে হতাহত পরিবারের স্বজন কিংবা আহতদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা আমরা শুনেছি। তাদের এই কষ্ট কোনো কিছু দিয়ে মোচন করা সম্ভব নয়। কারণ আমিও জানি স্বজন হারানোর বেদনা কতটুকু, কোনো কিছু দিয়ে এই বেদনা মোচন করা যায় না।

জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, দুইভাবে আমরা গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার চেষ্টা করতে পারি। এক. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। দুই. যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সাহসী মানুষগুলো রাজপথে নেমে এসেছিলেন, অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা।

শহীদ ও আহত পরিবারের উদ্দেশে তারেক রহমান আরো বলেন, আপনারা যখন নিজেদের কষ্ট, ব্যথা ও ত্যাগের কথা ব্যাকুলভাবে তুলে ধরছিলেন, তখন আমি এবং নজরুল ইসলাম খান সাহেব (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য) বসে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, যা তিনি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছেন। বিএনপি আগে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, তখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারদের কল্যাণের জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ইনশাআল্লাহ জনগণের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের দেখভালের জন্য সেই মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি আলাদা বিভাগ তৈরি করা হবে।’

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, যাদের আমরা হারিয়েছি, তাদের তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু যারা পেছনে রয়ে গেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের সুবিধা-অসুবিধা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে দেখভাল করতে হবে। কারণ, আপনারাও মুক্তিযোদ্ধা, আপনারাও যোদ্ধা।

তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে এই দেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জীবন দিয়েছেন আর ২০২৪ সালে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য মানুষ আবার রাজপথে নেমেছেন। ‘স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল’ ৭১-এ আর সেই স্বাধীনতাকেই রক্ষা করা হয়েছে ২০২৪ সালে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে এবং বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, শুধু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেই এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ। এর মধ্যে কয়েক শ মানুষ আছেন, যাদের এক বা দুই চোখ নষ্ট হয়ে গেছে, অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন। যেভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, সেটিকে এককথায় গণহত্যা বলা যায়।

তিনি বলেন, আপনাদের সাহসী ভূমিকার কারণেই ফ্যাসিবাদী চক্র শুধ রাষ্ট্রক্ষমতা নয়, বরং এই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট দেয়া নিজের বক্তব্যের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, সেদিন তিনি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার শহীদদের নাম উল্লেখ করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষার্থী, স্কুলের ছাত্র, আইনজীবী, রাজমিস্ত্রি, দোকানের কর্মচারী, গাড়িচালক, দিনমজুর, এমনকি ছয় বছরের শিশু রিয়াও সেই গণহত্যা থেকে রেহাই পায়নি। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর ছিল না। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সেদিনকার প্রতিটি ছবি তার সাক্ষ্য দেয়।

তারেক রহমান বলেন, আমি বলি, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের বছর আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার বছর।

তিনি বলেন, এই আন্দোলনের চেতনাকে সুসংহত করতে হলে দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। যারা এই স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়, তাদের বিষয়ে গণতন্ত্রকামী মানুষকে সজাগ থাকতে হবে বলে জানান তারেক রহমান।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আবদুস সাত্তার পাটোয়ারির সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনসহ শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখেন। এ সময় চোখের সামনে ছেলের খুনি ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু ছেলের খুনিকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন শহীদ শাফিক উদ্দিন আহনাফের মা জারতাজ পারভীন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে আপনারাও তো অনেক অত্যাচারিত হয়েছেন। আপনার মা দীর্ঘ বছর কারাগারে ছিলেন, আপনি দেশে আসতে পারেননি।

শহীদ জাহিদের মা ফাতেমা তুজ-জোহরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার সন্তানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আজ ১৭ মাস হয়ে গেছে, কেউ আর আমাকে সেই নামে ডাকে না। আমি কী নিয়ে বাঁচব?” তিনি আরো বলেন, এই কঠিন সময়ে বিএনপির পরিবার যদি আমার পাশে না দাঁড়াত, তাহলে কোনোভাবেই আমার ছেলের চিকিৎসা করানো সম্ভব হতো না। অনেকেই পাশে দাঁড়ায়নি, কিন্তু বিএনপি আমাদের পাশে ছিল। আমি বিশ্বাস করি, ইনশাআল্লাহ বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমাদের সন্তানদের হত্যার বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই করা হবে।

তারেক রহমানের সাথে ব্রাজিল ও সুইস রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ও সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো রেংগলি। গতকাল রোববার বিকেলে গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে পৃথকভাবে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য জানিয়েছেন। সাক্ষাৎকালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।