দেড় বছরেও নির্বাচন নয়, অফিসার্স ক্লাবেই ‘রাজনৈতিক সদরদফতর’

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের শীর্ষ আমলাদের সামাজিক ও পেশাগত মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত অফিসার্স ক্লাব ঢাকা- যেখানে থাকার কথা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের প্রতিফলন- সেটিই এখন রাজনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দখলের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও হয়নি কোনো নির্বাচন বা বৈধ কমিটি। বরং স্ব-ঘোষিত নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে ক্লাব। আর সেই নেতৃত্বে থাকা সাবেক যুগ্মসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকেই একটি বড় রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন- এমন দাবি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের।

প্রশ্ন উঠেছে- একটি সরকারি কর্মকর্তাদের ক্লাব কীভাবে রাজনৈতিক কার্যালয়ে রূপ নিল? কারা দিলেন সেই বৈধতা? আর প্রশাসনের আচরণবিধি কোথায়?

দখল থেকে নিয়ন্ত্রণ : কিভাবে শুরু

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর প্রশাসনে সৃষ্ট শূন্যতার সুযোগে রাজধানীর বিভিন্ন স্থাপনার মতো অফিসার্স ক্লাবেও প্রভাব বিস্তার করে একটি গ্রুপ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই ক্লাবের নিয়মিত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং নতুন নেতৃত্ব নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দেড় বছর পরও হয়নি কোনো নির্বাচন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী বা এডহক কমিটির মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন মাস। কিন্তু বাস্তবে সেই সময়সীমা পেরিয়েছে বহু আগেই।

‘এডহক কমিটি’-নথিতে নেই অনুমোদন : আব্দুস সাত্তারের দাবি, তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও ক্লাব চেয়ারম্যান মাহবুব হোসেন একটি এডহক কমিটি অনুমোদন করেছিলেন। তবে নথিপত্র বলছে ভিন্ন কথা।

২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবরের এক নোটিশে মাহবুব হোসেন স্পষ্ট ভাষায় জানান- তিনি কোনো এডহক কমিটি অনুমোদন করেননি।

এরপরই ক্লাবের ‘জবরদখল’ অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক কাজী কাইয়ুম শিশির। আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ অপরিবর্তিত রয়েছে।

ক্লাব না রাজনৈতিক কার্যালয়?

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বর্তমানে আব্দুস সাত্তার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব ছিলেন। ক্লাব সূত্রের ভাষ্য, ‘ক্লাবের ভেতরে নিয়মিত রাজনৈতিক বৈঠক হয়, নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ হয়, বাইরের নেতাকর্মীরাও আসেন।’ কথিত এডহক কমিটির বেশির ভাগ সদস্যও বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়।

আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ : সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার ২৫ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে- কোনো সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে- নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, জনপ্রশাসন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দফতরের একাধিক কর্মকর্তা এই গ্রুপের সাথে জড়িত। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এক উপসচিবের নামও এসেছে সক্রিয় সদস্য হিসেবে। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

‘পদায়ন-বাণিজ্য’ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ : একাধিক সূত্র দাবি করেছে- আওয়ামী লীগ আমলের কিছু সচিবকে বহাল রাখার শর্তে প্রায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি চাঁদা তোলা হয়। এরপর- সচিব নিয়োগ, ওএসডি, ডিসি/ইউএনও/এসিল্যান্ড পদায়ন, গুরুত্বপূর্ণ দফতরে পোস্টিং- এসব ক্ষেত্রে তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো শুরু হয়নি।

সচিবালয়ে প্রভাব ও ভয়ভীতি : ৫ আগস্টের পর ‘বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরাম’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে ওঠে। এর সভাপতি হন আব্দুস সাত্তার।

ফোরামের ব্যানারে-সচিব অপসারণের দাবিতে হট্টগোল, অতিরিক্ত সচিব অবরুদ্ধ, উপসচিব হেনস্তা-এসব ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রশাসনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চাপ সৃষ্টি করে সিদ্ধান্ত আদায়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল।’

প্রশাসন ক্যাডারে বিভক্তি : বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিএএসএ) নতুন কমিটি গঠন নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও বদলি আদেশ বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ে।

কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা মনে করছেন, ‘রাজনৈতিক লাইনে প্রশাসনকে ভাগ করার চেষ্টা হয়েছে।’

দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক : ২০২৫ সালের ৮ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে আব্দুস সাত্তার প্রশাসনে দুর্নীতির অভিযোগ তুললেও তিনি নিজেই পরে ইউএনও-এসিল্যান্ড পদায়নে ঘুষ নেয়ার গুঞ্জনে সমালোচিত হন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংগঠন তার অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বললেও তিনিও কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।

একের পর এক পদ ও সুবিধা : ৫ আগস্টের পর তিনি- বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রধান জাতীয় কমিশনার, রূপালী ব্যাংকের পর্ষদীয় নির্বাহী কমিটির পরিচালক, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অ্যাডহক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান।

একাধিক প্রশাসনিক পদে একই ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বড় প্রশ্ন : অফিসার্স ক্লাব কি এখনো আমলাদের নিরপেক্ষ পেশাগত প্রতিষ্ঠান- নাকি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্র? দেড় বছরেও নির্বাচন হয়নি কেন? এডহক কমিটির বৈধতা কোথায়? সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার জবাবদিহি কে নিশ্চিত করবে?

প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, স্বচ্ছ তদন্ত ও নির্বাচিত কমিটি গঠন ছাড়া আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়।