শিগগিরই ভারতের ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভারতের ভিসা প্রাপ্তি সহজতর হওয়া এবং বর্তমান স্থবিরতা কাটিয়ে শিগগিরই তা স্বাভাবিক হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। প্রতিবেশী এই রাষ্ট্রের সাথে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর ইকবালের লিখিত প্রশ্নের জবাবে সরকারের এমন অবস্থান ও আশাবাদের কথা জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। প্রশ্নোত্তর পর্ব টেবিলে উত্থাপিত হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী জানান, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক সৌহার্দ্য, বন্ধুত্ব ও সংহতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হচ্ছে অভিন্ন মূল্যবোধ, ঐতিহাসিক সংযোগ এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সুদৃঢ় বন্ধন। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সার্বভৌম সমতা, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে ভারতের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়ে ড. খলিলুর রহমান সংসদকে অবহিত করে জানান, ভারতের সাথে ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করতে সরকার ইতোমধ্যেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি ভারত সফরে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী, পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাথে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। ওই বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ ও ব্যবসায়িক ভিসার প্রক্রিয়া পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়ে জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুতই ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।

বৃত্তি-ফেলোশিপে শিক্ষার্থী গবেষকদের জন্য সরকারের বহুমাত্রিক উদ্যোগ : ঢাকা-১৮ আসনের সরকারি দলের সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের টেবিলে উত্থাপিত তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক বৃত্তি, ফেলোশিপ এবং অ্যাকাডেমিক বিনিময় কর্মসূচির সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারে শিক্ষা ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা জোরদার করা হয়েছে।

তিনি জানান, বিনিময় কর্মসূচির আওতায় শিক্ষক, গবেষক, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, নীতিপ্রণেতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদীয়মান তরুণ নেতৃত্বকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াতে বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ড. খলিলুর রহমান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইরাসমাস প্লাস, যুক্তরাজ্যের চিভনিং, জার্মানির ডিএএডি এবং নেদারল্যান্ডসের অরেঞ্জ নলেজ প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ভারতের আইসিসিআর ও আই-টেক কর্মসূচি এবং পাকিস্তানের নলেজ করিডোর ও পিটিএপি কর্মসূচির মাধ্যমে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরো জানান, চীনে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশী কর্মীদের প্রশিক্ষণ বিষয়ে একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে শিক্ষাবৃত্তি বৃদ্ধি, টিভিইটি ও এসটিইএম শিক্ষা সহযোগিতা এবং কর্মসংস্থান সংক্রান্ত আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জাপানের সাখে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণে ‘ইম্প­øয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইএসডিপি)’ চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আলোচনা চলছে, যা ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার টিএএফই এবং বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর, নবায়ন ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তুরস্ক, বেলারুশ ও গ্রিসের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং রাশিয়া, হাঙ্গেরি, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, ইউক্রেন, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মলদোভা, নর্থ ম্যাসেডোনিয়া, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, মন্টেনেগ্রো ও আলবেনিয়াসহ একাধিক দেশের সাথে শিক্ষা সহযোগিতা চুক্তি চূড়ান্তকরণ ও সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এসব সহযোগিতার আওতায় স্কলারশিপ প্রোগ্রাম, যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, ভাষা শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সঙ্কটময় সময়ে সৌদি আরবের পাশে আছে বাংলাদেশ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটময় সময়ে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ সৌদি আরবের পাশে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গত সোমবার রিয়াদে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী ওয়ালিদ বিন আবদুল করিম আল খুরেইজির সাথে সাক্ষাৎ করে এই বার্তা দিয়েছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্দেশ্যে পাঠানো বাংলাদেশের সংহতির বার্তা হস্তান্তর করেন।

সৌদি উপমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে সংহতি বার্তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কটময় এই সময়ে বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থনের জন্য তার সরকারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার সুযোগ অন্বেষণের মাধ্যমে সৌদি আরবের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার ও বহুমুখী করার ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের বাদশাহ এবং ক্রাউন প্রিন্সকে তাদের সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।