‘দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র মামলা’ মুসলিম নির্যাতনের প্রতীক
আলজাজিরার বিশ্লেষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ভারতে ‘দিল্লি দাঙ্গা ষড়যন্ত্র’ মামলাটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের অধীনে মুসলিমদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২০ সালে রাজধানী নয়াদিল্লিতে সংঘটিত ধর্মীয় দাঙ্গার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে থাকা পাঁচ মুসলিম ছাত্র এবং কর্মীকে জামিন দিয়েছে। কিন্তু শীর্ষ আদালত দুইজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের জামিন নাকচ করে দিয়েছেন।
২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তন, যাকে মুসলমানরা বৈষম্যমূলক বলে দাবি করে, তা দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের সূত্রপাত করে। দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু, ২০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার মুসলিমরা দাবি করেছিল যে ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ যেন নাগরিকত্বের ভিত্তি ধর্মকে না করে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যাদের মধ্যে অনেককেই ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ আইনের অধীনে গ্রেফতার করে এবং কয়েক ডজনকে হত্যা করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অধিকারকর্মীরা বলছেন, বিচার ছাড়াই ছাত্র এবং অধিকার কর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা মোদির হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকারের অধীনে মুসলিমদের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
শনিবার, নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি উমর খালিদকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, ‘আমরা সবাই তোমার কথা ভাবছি’। তাহলে মামলাটি কী? অভিযুক্ত কারা? আর কেনই বা এই মামলা ভারত এবং তার বাইরে এত বিতর্কিত হয়ে উঠল?
মামলাটি কী নিয়ে?
২০২০ সালে, মোদি সরকার আফগানিস্তান, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের নির্যাতিত হিন্দু, পার্সি, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন এবং খ্রিষ্টানদের নাগরিকত্ব দ্রুত প্রদানের জন্য নাগরিকত্ব আইন পরিবর্তন করে। ভারতজুড়ে মুসলমানরা তাদের বাদ দেয়ার বিরোধিতা করে বিক্ষোভ শুরু করে, নয়াদিল্লির শাহীনবাগে মহিলাদের নেতৃত্বে এক অবস্থান ধর্মঘট কয়েক দশকের মধ্যে ভারতের বৃহত্তম বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
মতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সিনিয়র নেতাদের নেতৃত্বে মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে, হিন্দু ডানপন্থী জনতা দিল্লির পূর্ব অংশে শান্তিপূর্ণ অবস্থান ধর্মঘটে আক্রমণ করে, যার ফলে মারাত্মক দাঙ্গা শুরু হয়। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার পর দিল্লিতে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতায় ৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের বেশির ভাগই মুসলিম।
প্রতিক্রিয়া হিসেবে, পুলিশ তদন্তের জন্য ৭৫৮টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করে এবং ২০০০ জনেরও বেশি লোককে গ্রেফতার করে। দিল্লি পুলিশ, মুসলিমদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে অভিযুক্ত, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ নেতাদের, যাদের মধ্যে অনেকেই তরুণ মুসলিম কর্মী, ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি এবং নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের জন্য দায়ী করেছে- এই দাবি আইন ও অধিকার বিশেষজ্ঞরা বাতিল করে দিয়েছেন। ‘প্রধান ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত একটি মামলায় কমপক্ষে ১৮ জন ছাত্রনেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
ভারতে এই মামলাটি এত বিতর্কিত কেন?
প্রধানমন্ত্রী মোদির অধীনে নয়াদিল্লি অতি-জাতীয়তাবাদ এবং কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার পর থেকে ষড়যন্ত্র মামলা- এবং অভিযুক্তদের সুশীলসমাজ বিচার বিভাগের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আলজাজিরাকে বলেছেন যে, স্পষ্টতই অবিরাম শুনানির তারিখ, আদালতে বেঞ্চ পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক বিলম্বের মধ্যে এই মামলাটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘দ্বৈত প্রকৃতি’কে বিভক্ত করে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াই উল্লেখ করেছেন যে ভারতীয় আদালতগুলো নিয়মিতভাবে অভিযুক্তদের জামিন দিয়েছে, যার মধ্যে কট্টর অপরাধী এবং ধর্ষকও রয়েছে। ‘[খালিদ ও ইমামকে জামিন না দেওয়া] একটি প্রশ্ন তোলে : আদালত কি রাজনৈতিক আখ্যান দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে? কারণ অন্যথায়, এই দু’জনকে জামিন না দেয়ার কোনো কারণ নেই, তিনি বলেন।
কিদওয়াই বলেন, বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা রাখার জন্য, এক বিলিয়নেরও বেশি ভারতীয়ের জন্য ‘সকলের জন্য সমান আইনের ধারাবাহিকতা’ থাকা প্রয়োজন। এবং মুসলিম আসামিদের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য বলে মনে হয় না, তিনি উল্লেখ করেন।
খালিদ ও ইমাম কেন কারাগারে থাকবেন?
সোমবার সকালে নয়াদিল্লির শীর্ষ আদালতে রায় ঘোষণা করে বিচারপতি অরবিন্দ কুমার এবং এনভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ বলেছে যে তারা নিশ্চিত নন যে খালিদ ও ইমামের দীর্ঘ বিচার-পূর্ব আটক এবং বিচারে বিলম্ব ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসেবে কাজ করে না।
আদালত উল্লেখ করেছে যে জামিনপ্রাপ্ত অন্যদের মতো কথিত ষড়যন্ত্রের শ্রেণিবিন্যাসে এই দু’জনের স্থান সমান নয়। বেঞ্চ বলেছে যে তারা ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ আইনের অধীনে একটি প্রাথমিক মামলা পেয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে এই দু’জন ষড়যন্ত্রে ‘কেন্দ্রীয় এবং গঠনমূলক ভূমিকা’ পালন করেছেন এবং এক বছর পরে জামিনের জন্য পুনরায় আবেদন করতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী এবং অধিকার কর্মী প্রশান্ত ভূষণ বলেন, ‘আমি মনে করি যে এই বিচারকরা সরকারি চাপের দ্বারা অযথা প্রভাবিত হয়েছেন। এবং খালিদ ও ইমামকে মুক্তি না দেয়ার জন্য এটি ছিল প্রচণ্ড সরকারি চাপ।’
ভূষণ বলেন, এখন ছাত্র কর্মীরা মূলত একটি অচলাবস্থার মধ্যে আছেন।’ তিনি আরো বলেন, এই মামলা দু’টি বিষয় দেখায় : মোদি সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অপব্যবহার করতে ইচ্ছুক; দ্বিতীয়ত, আদালতগুলোও সরকারের নির্দেশের কাছে মাথা নত করছে। ভূষণ বলেন, মোদি শাসনামলে ভারত আর গণতন্ত্র নয়।
ভারতে মামলার প্রভাব কী হয়েছে : নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এবং তার পরে দমন-পীড়নের পর এ মামলায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা একজন কর্মী এবং গবেষক নাতাশা নারওয়াল আলজাজিরাকে বলেন যে সরকারের দমন-পীড়নের কারণে, যেকোনো প্রতিবাদ যা সরকার এবং তার নীতির প্রতি চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে তা সহজেই অপরাধমূলক করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, সেমিনার, বক্তৃতা, সিনেমা প্রদর্শন, বা যেকোনো ধরনের সমাবেশের আয়োজন থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোটখাটো কার্যকলাপের ওপর নজরদারি করা হচ্ছে, যদি ফৌজদারি মামলা নাও হয়, তবুও শিক্ষার্থীরা কারণ দর্শানোর নোটিশ পেতে থাকে এবং সব ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সম্মুখীন হয়।