পাকিস্তানের দাবি মানতেই হচ্ছে আইসিসিকে
প্রসঙ্গ বাংলাদেশ
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
টি-২০ বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি মুখোমুখি হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সংক্রান্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা দেয় পাকিস্তান সরকার। এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তৈরি হয় তীব্র আলোচনা, যার প্রেক্ষিতে টনক নড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি)।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিসির ডেপুটি চেয়ারম্যান ইমরান খাজা পাকিস্তান সফরে যান। সেখানে তিনি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সাথে করেন দীর্ঘ বৈঠক। গত রোববার রাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠকে পাকিস্তান তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার জন্য কিছু শর্ত তুলে ধরেছে বলে আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের শর্তগুলো বাংলাদেশকে ঘিরেই। বাংলাদেশের আর্থিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, অংশগ্রহণ ফি প্রদান ও ভবিষ্যতে একটি আইসিসি টুর্নামেন্ট আয়োজনের নিশ্চয়তা- এই তিন দাবির বাস্তবায়নের ওপরই ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামা নির্ভর করছে পাকিস্তানের।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের উত্থাপিত তিনটি শর্তের মূল ফোকাস বাংলাদেশ। প্রথমত, টি-২০ বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারায় বাংলাদেশকে বাড়তি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বকাপে না খেললেও বাংলাদেশকে অংশগ্রহণ ফি প্রদান করতে হবে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে একটি আইসিসি টুর্নামেন্ট আয়োজনের সুযোগ দিতে হবে।
বৈঠক শেষে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ না খেললেও আইসিসির আয় থেকে পুরো অংশ দেয়ার বিষয়টি কার্যত মেনে নেয়া হয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ ঘিরে আইসিসির যে বিপুল রাজস্ব নির্ভরতা, তা প্রশ্নের মুখে পড়তেই বাংলাদেশের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। জিয়ো টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিসিবির দাবিগুলোর ভিত্তিতে আইসিসি একটি ‘কম্পেনসেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করেছে। এই কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ সরাসরি আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেতে পারে, আবার ভবিষ্যতে কোনো আইসিসি টুর্নামেন্ট আয়োজনের স্বত্ব পেতেও পারে। এত দিন আইসিসির রাজস্ব বণ্টন নির্ভর করত মাঠের অংশগ্রহণের ওপর। এবার দর্শক বাজার, সম্প্রচার ভিউয়ারশিপ এবং আঞ্চলিক প্রভাবকেও আয় ভাগের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো বড় দর্শক বাজারকে এই হিসেবের ভেতরে রাখা আইসিসির অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
এই সমঝোতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য শাস্তি থেকে মুক্তি। ভারতে যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আলোচনা চলছিল, ক্ষতিপূরণ ফর্মুলা সেটিকেও কার্যত অকার্যকর করে দিচ্ছে। বরং আইসিসির পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সমর্থনসূচক অবস্থান নেয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার ফলাফল শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পাকিস্তান যদি শেষ পর্যন্ত ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে সম্মত হয়, তবে সেটির পেছনে বাংলাদেশের ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে অগ্রগতি একটি বড় ভূমিকা রাখবে। ক্রিকেটের নতুন অর্থনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর দর্শক নয়; ক্ষতিপূরণ ফর্মুলার মধ্য দিয়ে তারা হয়ে উঠছে অংশীদার!
টেলিকম এশিয়া স্পোর্টের বরাতে জানা যায়, ভারত ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পাকিস্তান জিয়ো নিউজ জানিয়েছে, সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে শিগগিরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সাথে সাক্ষাৎ করবেন পিসিবি চেয়ারম্যান। সেই বৈঠকের পরই ভারত ম্যাচ নিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানা যাবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর একাংশ দাবি করেছে, পাকিস্তানের শর্তগুলোর একটি অংশ তাদের নিজেদের স্বার্থসংক্রান্ত। এর মধ্যে রয়েছে আইসিসি থেকে প্রাপ্ত আর্থিক লভ্যাংশ বৃদ্ধি ও দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আবার চালুর দাবি। এ ছাড়া অতীত এক টুর্নামেন্টে ভারতীয় ক্রিকেটারদের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান।
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবদান ও উন্নয়ন বিবেচনায় আইসিসির কাছ থেকে বাড়তি আর্থিক অংশীদারিত্ব চাওয়া হয়েছে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের কারণে অংশগ্রহণ ফি পাওয়াকে তারা যৌক্তিক মনে করছে। পাশাপাশি, একটি আইসিসি ইভেন্ট আয়োজনের দাবি তুলে বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশটির কাছে এখন আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দর্শক-সমর্থন রয়েছে। এতে বাংলাদেশের ক্রিকেট অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি বৈশ্বিক ক্রিকেট মানচিত্রেও দেশটির অবস্থান আরো দৃঢ় হবে।