এপিসি থেকে ইয়ামিনকে গুলি
১৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিলো ট্রাইব্যুনাল
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
রক্তে রাঙানো সেই জুলাইয়ের বিকেলে যে নিষ্ঠুরতা নাড়িয়ে দিয়েছিল পৃথিবীর সমস্ত সুপ্ত বিবেক, সাঁজোয়া যান থেকে ছুড়ে ফেলা সেই নিথর তরুণের অবরুদ্ধ চিৎকার অবশেষে খুঁজে পেল আদালতের প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষা। ২০২৪-এর ১৮ জুলাই সাভারের তপ্ত রাজপথে এমআইএসটি শিক্ষার্থী আসহাবুল ইয়ামিনকে সাঁজোয়া যান (এপিসি) থেকে নির্মমভাবে গুলি করে ফেলে দেয়ার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই সাথে রক্তের কালিতে আঁকা সেই নৃশংসতার মূল চ্যাপ্টারে অভিযুক্ত পলাতক ১৩ আসামির বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। আর অন্য মামলায় ইতোমধ্যেই বন্দী থাকা ছয়জনের জন্য আদালত ঝুলিয়ে দিয়েছে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজিরার পরোয়ানা।
গতকাল রোববার কাঠগড়া ও আইনের নিথর গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাস যখন থমকে দাঁড়ায়, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর প্রধান বিচারক বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল সেই বিভীষিকাময় ভিডিও ফুটেজ ও নথি পর্যালোচনা করে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেন।
বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর নিরব পর্যবেক্ষণে মেপে নেন শত সহস্র জীবনের বিনিময়ে অর্জিত ন্যায়বিচারের পাল্লা। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে সেই বিষাদময় স্মৃতির পাতা উল্টে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম, যার আরজিতে মিশে ছিল অপরাধীদের শিকল পরানোর আকুল আহ্বান। শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গণমাধ্যমের সামনে এসে থমকে থাকা সময়ের বার্তা পৌঁছে দেন ভিডিওর প্রতিটি ফ্রেমে ফুটে ওঠা সেই বর্বরতাই আজ আসামিদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রাথমিক পথকে নিশ্চিত করেছে।
সাভারের বাজার বাসস্ট্যান্ডের সেই রক্তভেজা স্মৃতির কোণে আজও স্তব্ধ হয়ে আছে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের উদীয়মান নক্ষত্র আসহাবুল ইয়ামিন। শান্তিকামী মিছিলে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে দেয়া সেই তরুণকে সেদিন পুলিশ ও শাসকদলের অস্ত্রধারীরা সাঁজোয়া যানের কাছে টেনে নিয়ে নির্মমভাবে বুকের বাঁ পাশে বুলেট বিদ্ধ করেছিল। কেবল রক্ত ঝরিয়েই ক্ষান্ত হয়নি নিষ্ঠুরতা; ইয়ামিনের মুমূর্ষু শরীরকে এপিসির ছাদে ফেলে রেখে শহরজুড়ে চালানো হয়েছিল ত্রাসের মহড়া। একপর্যায়ে যানের ওপর থেকে তাকে পিচঢালা রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয় এবং নিথর পায়ে পুনরায় বুলেট চালানোর হুকুম আসে। সেই বিভীষিকা পার হয়ে ডিভাইডারের পাশে ফেলে রাখা রক্তভেজা ইয়ামিনকে যখন হাসপাতালের হিমঘরে নেয়া হয়, ততক্ষণে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন পরকালের পথে যে ছবি স্তম্ভিত করেছিল বিশ্বকে, দাবানলের মতো জ্বালিয়ে তুলেছিল ছাত্র-জনতার ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিরোধকে।
আদালতের নথিতে নাম উঠে আসা সেই ১৯ আসামির তালিকায় রয়েছে অপরাধের নানা কারিগর সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম, সাভার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজিব, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক এসপি আসাদুজ্জামান রিপনসহ সাভার ও আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি ও কয়েকজন কনস্টেবল। বিমানবন্দর থেকে পালানোর সময় ধৃত কাফীসহ পুলিশের ছয় সদস্যকে আগামী ২৫ আগস্ট ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় হাজির করার কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যে রক্তের ওপর ভর করে ইতিহাস নতুন বাঁক নিয়েছিল, বিচারিক আদালতে গতকাল তারই আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো।
হাসিনা-বেনজীরসহ ৮ জনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা
এদিকে কক্সবাজারের টেকনাফে ক্রসফায়ারে একরামুল হক হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে আটজনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও তিনজনকে হাজিরের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। তিনি এ মামলায় আনা অভিযোগ তুলে ধরার পাশাপাশি ফরমাল চার্জ আমলে নেয়ার আবেদন করেন।
শুনানি শেষে অভিযোগটি আমলে নিয়ে গ্রেফতার আসামিদের হাজিরের নির্দেশ দেন আদালত। এ ছাড়া পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। একই সাথে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৫ আগস্ট দিন ধার্য করা হয়।
আসামিরা হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন (সেনাবাহিনীতে কর্মরত), কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), মেজর রুহুল আমিন, সেনা কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও সেনা কর্মকর্তা আশিকুর রহমান। এর মধ্যে অন্য মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ ও মাহাবুব আলম।
গতকাল সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এ অভিযোগ দাখিল করা হয়। ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন একরামুল হক। তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। এ ঘটনায় ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে...’ একরামুলের মেয়ের একটি অডিও রেকর্ড তখন দেশজুড়ে আলোচিত ছিল।