আর্থিক টানাপড়েনে প্রকল্পে কাটছাঁট : সেচের স্বপ্নও বাদ
Printed Edition
- সমীক্ষায় ব্যয় প্রস্তাব এক হাজার ২৭৮ কোটি টাকা
- অর্থ বিভাগের আপত্তিতে কমে ৩৯৬ কোটি টাকা
- সেচ সুবিধা বাড়বে মাত্র ৬ হাজার ৭০৫ হেক্টরে
সরকারের আর্থিক টানাপড়েনে সেচ প্রকল্পেও কাঁচি চালানো হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের চার জেলার বিস্তীর্ণ প্রান্তরের ছবিটা বদলানোর কথা ছিল। তিস্তা কিংবা করতোয়াপাড়ের কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে হাতে নেয়া হয়েছিল এক বিরাট কর্মযজ্ঞ ‘রংপুর অঞ্চলে ক্ষুদ্রসেচ উন্নয়ন ও সেচ দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প’। কিন্তু খরচ নিয়ে টানাপড়েন আর বাস্তবতার কড়া অঙ্কে সেই মহাআয়োজনের কলেবর এক ধাক্কায় ছাঁটাই হয়ে গেল প্রায় তিন গুণ! সমীক্ষায় বলা হয়েছিল এক হাজার ২৭৮ কোটি টাকার খরচ। সেটা হলো ৩৯৬ কোটি টাকা এবং কমে এলো সেচকার্যক্রম। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো: মাহমুদুল হোসাইন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে এই বড়সড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের চেহারা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রকল্পে মেশিনের পাশাপাশি গ্রামীন শ্রমিকদের দিয়ে খাল কাটার সুযোগ রাখতে হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিলে বিএডিসির (রংপুর সার্কেল) তথ্য থেকে জানা গেছে, সারা দেশের মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৮০.২৫ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা সংস্থা কর্তৃক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে অদ্যাবধি প্রায় ৫৭.৭৯ লক্ষ হেক্টর জমি (৭২.০১ শতাংশ) সেচের আওতায় এসেছে। অবশিষ্ট প্রায় ২২.৪৬ লাখ হেক্টর জমি (২৭.৯৯ শতাংশ) সেচের আওতা বহির্ভূত রয়েছে। আর রংপুর অঞ্চলের (রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার) মোট সেচযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৮০ হেক্টরের মধ্যে সেচকৃত জমির পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৫৮ হেক্টর (৮৩.১৪ শতাংশ)। সেচসুবিধা বহির্ভূত জমির পরিমাণ প্রায় ৯১ হাজার ৪২২ হেক্টর (১৬.৮৬ শতাংশ)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত ৬ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে সেচসুবিধা সম্প্রসারণ করে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ৫৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিকটন অধিক খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশের আলোকে প্রকল্পটি মোট এক হাজার ২৭৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু প্রকল্পটি জিওবি অর্থায়নের প্রস্তাব করায় অর্থায়নের প্রকৃতি (অনুদান/ঋণ/ইক্যুইটি) নির্ধারণের জন্য অর্থ বিভাগের পূর্ব সম্মতি চাওয়া হলে অর্থ বিভাগ কর্তৃক ৩৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ৬৯ হাজার (জিওবি অনুদান) টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।
প্রকল্প মূল্যায়ন সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় এই প্রকল্পের জন্য প্রায় ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকার প্রাক্কলন করা হয়েছিল। কিন্তু অর্থ বিভাগ সাফ জানিয়ে দেয়, এই বিশাল অঙ্কের অনুদান দেয়া সম্ভব নয়। ফলস্বরূ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসে প্রকল্পের বাজেট এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৯৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকায়। বাজেট কমে যাওয়ায় সঙ্কুচিত হয়েছে কাজের পরিধিও। গোড়ার দিকে যেখানে ৮ হাজার ১০০ হেক্টর জমির জলাবদ্ধতা কাটানোর পরিকল্পনা ছিল। সেখানে এখন তা কমিয়ে সাড়ে চার হাজার হেক্টরে নামিয়ে আনা হয়েছে। ২৫০ কিলোমিটার খালের বদলে পুনঃখনন হবে ১৫৫ কিলোমিটার। তবে কৃষকদের মরমিয়া অবস্থাকে কিছুটা স্বস্তি দিতে আশার আলোও রয়েছে। সভায় একমত হওয়া হয়েছে যে, বাদ পড়া কাজগুলো নিয়ে পরবর্তীতে এই প্রকল্পেরই একটি দ্বিতীয় পর্যায় বা ‘ফেজ-২’ আনা হবে বলে পরিকল্পনা কমিশনের পানিসম্পদ ও সেচ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
প্রকল্পের নতুন রূপরেখা কী?
সুপারিশের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পে কাটছাঁট হলেও প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অর্থাৎ রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ২৮টি উপজেলার কৃষিতে সেচদক্ষতা বাড়ানোর কাজ যে থেমে থাকছে না তা স্পষ্ট। সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী : অতিরিক্ত ৬ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে নতুন সেচসুবিধা। ২ হাজার ৩৫৯ হেক্টর এক ফসলি জমিকে দুই ফসলি জমিতে রূপান্তর করা হবে। এর হাত ধরে প্রতিবছর ঘরে উঠবে অতিরিক্ত প্রায় ৫৬ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। আর ডিপিপিতে প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ বছর (২০২৫-২০৩০) বলা হলেও, ইতোমধ্যে অনেকটা সময় গড়িয়ে যাওয়ায় তা কমিয়ে অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০৩০ মেয়াদে পুনর্গঠন করতে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কড়া নজরদারি
ডিপিপি সংশোধনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে প্রকল্পর ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, সেচ চার্জে কৃষকের স্বস্তির জন্য পাম্প মালিক বা ম্যানেজারদের খপ্পরে পড়ে কৃষকদের যেন ইচ্ছেমতো চড়া সেচ চার্জ গুনতে না হয়। সে জন্য উপজেলা সেচ কমিটির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট চার্জ নির্ধারণ ও কঠোর মনিটরিংয়ের দাওয়াই দেয়া হয়েছে।
গত ১০ বছরে সেচ বাবদ আদায় ও বকেয়ার খতিয়ানও ডিপিপিতে জুড়তে বলা হয়েছে। আর খাল খননে জনসম্পৃক্ততায় খাস খতিয়ান বা সিএস ম্যাপ মেনে খালের সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক ডিজাইন (উৎপত্তি, আউটফল, বেসিন ও সাব-বেসিন বিবেচনা করে) করতে হবে। শুধু ভারী এক্সকাভেটর বা যন্ত্রের ওপর ভরসা না করে স্থানীয় শ্রমিক বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিরও সুযোগ রাখতে হবে, যাতে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের পথও খোলা থাকে। দ্বৈততা এড়াতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রত্যয়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি খালের পাড় রক্ষায় বিন্না ঘাস বা গভীর মূলের ঘাস লাগানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও স্মার্ট ফার্মিং এ প্রকল্পের নামে গাড়ি ভাড়ার মতো অপ্রয়োজনীয় রাজস্ব খরচ এক কলমে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। বিএডিসির নিজস্ব গাড়ির জ্বালানি বহাল রেখে ভাড়ার গাড়ি বাদ দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, বিএডিসির নিজস্ব জায়গায় ১৫ সেট ‘স্মার্ট ফার্মিং সিস্টেম’ স্থাপনের অভিনব উদ্যোগ রাখা হয়েছে। যা আধুনিক কৃষিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
পাইপের সঠিক ব্যবহারে ১ ও ২-কিউসেক ক্ষমতার এলএলপি সেচযন্ত্র দিয়ে নামমাত্র দূরত্বে পাইপ না বসিয়ে মাঠের বাস্তব চাহিদা ও যন্ত্রের পূর্ণ ক্ষমতার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে বারিড পাইপের দৈর্ঘ্য (কমান্ড এরিয়া) বাড়িয়ে পুনর্নিধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।