রাষ্ট্রীয় গুমের বিচার শুরু

গুম ছিল ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর সচেতন কৌশল

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত বলপ্রয়োগপূর্বক গুমের বিচারের ঐতিহাসিক সূচনা হয়েছে। প্রসিকিউশন তাদের উদ্বোধনী বক্তব্যে এই মামলাটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, গুম কেবল কিছু ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; এটি ছিল একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় দমননীতি। এই দমননীতির মাধ্যমে সমাজে ভয়, অনিশ্চয়তা ও নীরবতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া আইসিসি কেস নং-০৪/২০২৫ সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর ১০(ঘ) ধারায় এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়েছে। প্রসিকিউশন স্পষ্ট করেছে, এই অপরাধগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না; বরং এগুলো ছিল ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর একটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল। গুমের লক্ষ্য কেবল লাশ গোপন করা নয়, বরং ভুক্তভোগীকে ‘জীবিত ও মৃতের মাঝখানে’ ঝুলিয়ে রাখা। এর ফলে ভুক্তভোগী যেমন আইনি আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি তার পরিবারও আজীবন অনিশ্চয়তার দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই নীতি প্রয়োগ করে বিরোধী মতাবলম্বীদের গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে।

মামলার শুনানিতে বলা হয়, নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়ার বদলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একপর্যায়ে ‘ভাড়াটে বাহিনীতে’ পরিণত করা হয়েছিল। গুমের মাধ্যমে সংবিধান, ফৌজদারি আইন ও হেবিয়াস কর্পাস রিটকে কার্যত অকার্যকর করে দেয়া হয়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো থানায় থানায় ঘুরে কেবল ‘আমরা কিছু জানি না’ শীর্ষক যে উত্তর পেয়েছে, তা ছিল রাষ্ট্রের একটি ইচ্ছাকৃত কৌশল। এর মাধ্যমে এমন এক ভীতিময় পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়ার পথ অবশিষ্ট ছিল না।

এই মামলার অন্যতম গুরুত্ব হচ্ছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের অধীনস্থ ‘সিএফআই সেল’। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই গোপন বন্দিশালায় গুম হয়ে থাকাকালীন যারা বেঁচে ফিরেছেন (সারভাইভার), এমন ১৪ জনের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার হচ্ছে এই মামলায়। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে এবং সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে।

আসামি তালিকায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে র‌্যাবের সাবেক মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) এবং ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালকদের নাম রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, গুম ছিল একটি সুপরিকল্পিত ও ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় প্রকল্প।

প্রসিকিউশন এই মামলায় আন্তর্জাতিক আইনের শক্ত ভিত্তি তুলে ধরেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট-১৯৭৩ ছাড়াও রোম স্ট্যাটিউট, জাতিসঙ্ঘের ১৯৯২ সালের ঘোষণাপত্র, ২০০৭ সালের বলপূর্বক গুমবিরোধী কনভেনশন এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়কে এই বিচারের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর্জেন্টিনা ও চিলির অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, গুম রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে অনিরাপদ করে তোলে এবং আইনবহির্ভূত বাহিনী একসময় রাষ্ট্রের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

গুমের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে নথিপত্র ও ডিজিটাল রেকর্ড মুছে প্রমাণ নষ্ট করা হয়। তাই এই মামলায় গুম থেকে ফিরে আসাদের সাক্ষ্য, পরিবারের বর্ণনা, মোবাইল লোকেশন ডেটা এবং বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ও তদন্ত সংস্থার রিপোর্টকে প্রধান সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতের নজির অনুযায়ী, এমন বিশেষ পরিস্থিতিতে সাক্ষ্য মূল্যায়নের যে স্বতন্ত্র মানদণ্ড রয়েছে, তা এই মামলায় প্রয়োগ করা হচ্ছে।

প্রসিকিউশন তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেছে, এই বিচার কেবল অতীতের বিচার নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি জোরালো নীতিগত ঘোষণা। রাষ্ট্র যদি গুমের বিচার নিশ্চিত না করে, তবে ভবিষ্যতে আবারো কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তি মানুষকে অদৃশ্য করার সাহস পাবে। এই বিচারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা, মানবাধিকার এবং জবাবদিহিতার নতুন সীমারেখা নির্ধারিত হচ্ছে। এটি নিখোঁজ মানুষদের সন্ধানের পাশাপাশি একটি রাষ্ট্র কতটা মানবিক হতে পারে- সেই ঐতিহাসিক প্রশ্নেরও জবাব দেবে।