ওপেক থেকে বেরিয়ে গেল আমিরাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ধাক্কা
১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওপেক বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বর্তমানে সংগঠনটি বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরবরাহ করে থাকে।
Printed Edition
আলজাজিরা ও রয়টার্স
তেল উৎপাদনকারী জোট ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ সিদ্ধান্তকে জ্বালানি বাজারের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন ইরানকে ঘিরে সঙ্ঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপে জোটটির কার্যকারিতা ও প্রভাব প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে এর অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বে থাকা সৌদি আরবের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ দিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ইতোমধ্যেই তাদের রফতানি কার্যক্রমে বাধার মুখে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হরমুজ প্রণালীতে ইরানি বাহিনীর তৎপরতায় পরিবহন ঝুঁকি বেড়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত অভিযোগ করে বলেছে, যুদ্ধ চলাকালে ইরানের একাধিক হামলার মুখে পড়লেও অন্যান্য আরব দেশগুলো তাদের সুরক্ষায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। এই অসন্তোষ থেকেই তাদের এ সিদ্ধান্ত এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওপেক বিশ্ব তেল সরবরাহের অন্যতম শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বর্তমানে সংগঠনটি বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরবরাহ করে থাকে। ফলে আমিরাতের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশের সরে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্তের ফলে তেলের দাম আরো অস্থির হয়ে উঠতে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে ওপেকের সদস্য থাকা আমিরাতের এই বিচ্ছেদ জোটের ভেতর বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। সাধারণত বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক ইস্যু বা উৎপাদনের কোটা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকলেও ওপেক এত দিন নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছিল। তবে আমিরাতের এই প্রস্থান সেই ঐক্যে ফাটল ধরাল। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ১ মে। বুধবার ওপেকের ভিয়েনা বৈঠকের আগে এ ঘোষণা দেয়া হলো। পাশাপাশি জোটের বৃহত্তর অংশ ওপেকপ্লাস থেকেও আমিরাত বেরিয়ে যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ডব্লিএএম প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উৎপাদন নীতি, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতা সবকিছু পুনর্মূল্যায়ন করে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে আমাদের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এবং বাজারের জরুরি চাহিদা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, আরব উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতাসহ স্বল্পমেয়াদি সরবরাহ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করলেও মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বের জ্বালানি চাহিদা বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আমিরাতি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত আমিরাতের নীতি নির্ধারণী পথপরিক্রমায় একটি বিবর্তন। বাজারের গতিশীলতায় সাড়া দেয়ার নমনীয়তা বাড়ানোর পাশাপাশি সংযত ও দায়িত্বশীল উপায়ে স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখার প্রতিফলন ঘটবে এতে।
আমিরাতের অর্থনীতিতে এখন অপরিশোধিত তেলখাতের বাইরের অংশের অবদান প্রায় ৭৫ শতাংশ জিডিপিতে। তেলনির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে দেশটি। তবে ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল উৎপাদন ৫০ লাখে উন্নীত করার আগ্রহও তারা জানিয়েছে। ইতোমধ্যে উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল রফতানি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চলাচল করে। ইরানের তরফ থেকে জাহাজগুলোর ওপর হুমকি ও হামলার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ রুট দিয়ে পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ দিকে ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগের এই ঘটনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প বরাবরই এই জোটের সমালোচনা করে আসছেন। তার অভিযোগ, ওপেক তেলের দাম বাড়িয়ে ‘পুরো বিশ্বকে ঠকাচ্ছে’। ট্রাম্প উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতি মার্কিন সামরিক সমর্থনের বিষয়টিও তেলের দামের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ওপেক সদস্যদের সুরক্ষা দিলেও তারা ‘তেলের উচ্চমূল্য আরোপ করে এর সুযোগ নিচ্ছে’।
এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিষ্ক্রিয়তা। ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং আঞ্চলিক ব্যবসায়িক কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধের সময় ইরানের অসংখ্য হামলার মুখে তাদের রক্ষায় প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
সোমবার গালফ ইনফ্লুয়েন্সারস ফোরামের এক অধিবেশনে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ইরানের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, লজিস্টিক দিক থেকে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা) দেশগুলো একে অপরকে সমর্থন দিয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে আমার মনে হয়, এটি ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থান। তিনি আরো বলেন, ‘আমি আরব লীগের কাছ থেকে এমন দুর্বল অবস্থান আশা করেছিলাম, তাই এতে আমি অবাক হইনি। কিন্তু জিসিসির কাছ থেকে এটি আশা করিনি এবং আমি এতে বিস্মিত।’