বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ

Printed Edition
back-4
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ

নাসিম সিকদার

‘রোগমুক্ত সুস্থ জীবন যাপন প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার’- এই মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ ৭ এপ্রিল পালিত হতে যাচ্ছে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’। ১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল জাতিসঙ্ঘের ২৬টি সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) গঠিত হয়। সংস্থার এই জন্মলগ্নকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৫০ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি গুরুত্বের সাথে পালিত হয়ে আসছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, এর মূল কাজ হলো পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের স্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন করা। ১৯৭৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সমাবেশে ‘২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য সুস্বাস্থ্য’ ঘোষণার মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধির ওপর জোর দেয়া হয়। নিরাপদ পানি সরবরাহ, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, মা ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সংস্থাটি নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে ১৭৩টি সদস্য দেশ নিয়ে জেনেভাভিত্তিক এই সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে ছয়টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৯ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। জনবহুল এই দেশে স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো অত্যন্ত ব্যাপক হলেও বিগত কয়েক দশকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিশেষ করে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে রোল মডেল।

বর্তমানে দেশে পোলিও, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, কুষ্ঠ, হাম ও ধনুষ্টঙ্কারের মতো রোগের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। মা ও শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যার ক্ষেত্রে সাফল্যের ফলে মাতৃমৃত্যু এবং শিশুমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে, যা বৈশ্বিকভাবে প্রশংসিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশে বর্তমানে ৭টি বিশেষ ক্ষেত্রে কারিগরি ও বৈষয়িক সহায়তা প্রদান করছে :

১. সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ।

২. স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যের উন্নয়ন।

৩. মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা এবং সামাজিক পরিবর্তনজনিত সমস্যার সমাধান।

৪. উন্নত স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও ওষুধ শিল্পের বিকাশ।

৫. স্বাস্থ্য নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে তথ্য ব্যবস্থার (ঝওঝ) আধুনিকায়ন।

৬. স্থিতিশীল উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ।

৭. জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দক্ষ জনশক্তি (চিকিৎসক, নার্স ও বিশেষজ্ঞ) তৈরি।

প্রতি বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো- জনগণকে স্বাস্থ্য বিষয়ে অবহিত করা, সচেতন করা এবং উদ্বুদ্ধ করা। ম্যালেরিয়া, ক্যান্সার, এইডস কিংবা আধুনিক সময়ের মাদকাসক্তির মতো মরণব্যাধি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে বৈশ্বিক ঐক্য এবং গণসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষ যাতে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে পূর্ণ কর্মক্ষম জীবন যাপন করতে পারে, সেটিই এই দিবসের মূল অঙ্গীকার। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি সুস্থ সুন্দর পৃথিবী বিনির্মাণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা আগামী দিনে আরো ফলপ্রসূ হবে- এটাই আজকের প্রত্যাশা।

তবে ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানুষ প্রধানত দু’টি বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন। প্রথমটি হলো অসংক্রামক ব্যাধি (ঘড়হ-ঈড়সসঁহরপধনষব উরংবধংবং), যা বর্তমানে দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কিডনিজনিত সমস্যা এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে দেখা দিচ্ছে। দ্বিতীয় ঝুঁকিটি হলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত রোগ। অনিয়মিত তাপপ্রবাহ ও অতিবৃষ্টির কারণে ডেঙ্গু শ্বাসকষ্টজনিত এবং হাম রোগের প্রাদুর্ভাব শহরগুলোতে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় জোর দিতে হবে। শহরগুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা, চিনি ও লবণযুক্ত খাবারের ওপর ‘হেলথ ট্যাক্স’ আরোপ করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার (ঐবধষঃয ঝপৎববহরহম) সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সোহানা আশকারী সৃষ্টি নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৮-৭০% নাগরিককে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বোচ্চ। এটি কমাতে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে এর কিছু বিকল্প বা পরিপূরক ব্যবস্থাও রয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা।

স্বাস্থ্য বীমা একটি শক্তিশালী সমাধান হলেও এটি বাস্তবায়নের জন্য সুশাসন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন জরুরি। একই সাথে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে কেবল ‘রেফারেল সেন্টার’ হিসেবে না রেখে সেগুলোকে অসংক্রামক ব্যাধি চিকিৎসার প্রাথমিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।