বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত

বিল হাওর, বাঁওড়, ম্যানগ্রোভ বন নিয়ে সচেতন হতে হবে

Printed Edition
3rd-3
বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

গতকাল সোমবার বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত হয়েছে। প্রতি বছর ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিবেশগত দিবস হিসেবে এটি পালিত হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে ইরানের রামসার শহরে ‘রামসার কনভেনশন’ নামে জলাভূমি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো- মানুষ ও পৃথিবীর জন্য জলাভূমির (বিল, হাওর, বাঁওড়, ম্যানগ্রোভ বন প্রভৃতি) অপরিসীম গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং এসবের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা। রামসার কনভেনশনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন হয়ে আসছে।

দিবসটি উপলক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইফ নেচার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ ক্লাব (লিনার্ক) ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে র‌্যালি, জলাভূমিবিষয়ক তিনটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু অ্যাকাডেমিক ভবনের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ১৫০ নম্বর কক্ষে অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন জীববিজ্ঞান অনুষদের অধিকর্তা প্রফেসর ড. মো: গোলাম মোর্তুজা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আমিরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লিনার্কের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. সাবরিনা নাজ।

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাস ও প্রফেসর ড. আমিনুজ্জামান মো: সালেহ রেজা। এ ছাড়া অনলাইনে যুক্ত হন নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সানু রাজা মহারাজন।

প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র দাস বলেন, ‘জলাভূমির জীববৈচিত্র্যে অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও জলজ উদ্ভিদের গুরুত্ব আমরা এখনো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি। এগুলোকে চিহ্নিত, গবেষণা ও সংরক্ষণ করা জরুরি।’

সানু রাজা মহারাজন নেপালের জলাভূমিতে পাখির বৈচিত্র্য তুলে ধরে জলাভূমি বিলুপ্তির ঝুঁকি ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেন।

প্রফেসর ড. আমিনুজ্জামান মো: সালেহ রেজা বলেন, ‘জলাভূমি শুধু মাছের আবাসস্থল নয়, প্রায় ৪০ শতাংশ পাখির প্রজননস্থল। আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই এসব জলাভূমি সংরক্ষণ করা জরুরি।’ অন্য দিকে প্রফেসর ড. হাসানুর রহমান বলেন, ‘জীবের অস্তিত্ব পানির ওপর নির্ভরশীল। জলাভূমি পানি ও জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। তরুণদের এগিয়ে এসে সংরক্ষণে দায়িত্ব নিতে হবে।’

সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. সাবরিনা নাজ বলেন, ‘জলাভূমি প্রকৃতির রতœভাণ্ডার, যার বিরাট অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত। উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই বাস্তুতন্ত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’ আলোচনা সভার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিবিষয়ক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়।

এবারের প্রতিপাদ্য : ঐতিহ্য ও জলাভূমির বন্ধন

২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী দিবসটি ‘জলাভূমি এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান : সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপন’ প্রতিপাদ্যে পালিত হচ্ছে। এই প্রতিপাদ্যের মাধ্যমে জলাভূমিকে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনধারা ও প্রজন্মান্তরে অর্জিত ঐতিহ্যগত জ্ঞানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ একটি জলাভূমিনির্ভর দেশ। হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝিল, নদ-নদী, উপকূলীয় জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ বনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে জেলে সম্প্রদায়, কৃষিজ সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান ও টেকসই জীবনব্যবস্থা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মানুষ জানতেন কখন মাছ ধরা যাবে, কোন জলাশয় বিশ্রামে রাখতে হবে, কোন উদ্ভিদ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে- এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানই ছিল জলাভূমি সংরক্ষণের কার্যকর হাতিয়ার।

কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দখল, দূষণ ও প্রথাগত জ্ঞান উপেক্ষার ফলে জলাভূমি দ্রুত অবক্ষয়ের মুখে পড়েছে। এতে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাভূমি সংরক্ষণে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নই পারে টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

নাটোরে বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত

বাসস জানায় ‘লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে করি জলাভূমি সংরক্ষণ’-এই প্রতিপাদ্য বিষয়ে জেলায় বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালিত হয়েছে।

এ উপলক্ষে সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় জেলা প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জীববৈচিত্র্য ভারসাম্য সুরক্ষা কেন্দ্রের সভাপতি ড. হেলাল উদ্দিন।

জীববৈচিত্র্য ভারসাম্য সুরক্ষা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক মো: আব্দুল হাকিমের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মো: শহীদুল হক সরকার এবং সাবেক সভাপতি ফারাজী আহম্মদ রফিক বাবন।

সভায় বক্তারা বলেন, আগামী প্রজন্মের জন্যে নিরাপদ আবাস ভূমির জন্যে পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা প্রদান একান্ত অপরিহার্য। আর এজন্যে প্রয়োজন সুরক্ষিত জলাভূমি। এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

বক্তারা চলনবিলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্যে চলনবিল কর্তৃপক্ষ গঠনের জন্যে সরকারের নিকট দাবি জানান। বাংলাদেশ বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন ফেডারেশনের সহযোগিতায় জীববৈচিত্র্য ভারসাম্য সুরক্ষা কেন্দ্র এ সভার আয়োজন করে।