জুলাই বিপ্লবের দুই বছর

বিচার নেই, জামিনের মিছিল আজও অপোয় শহীদ পরিবার

Printed Edition

হাবিবুল বাশার

২০২৪ সালের ১৪ জুলাই মধ্যরাতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীরা হলের তালা ভেঙে রাস্তায় নেমে আসেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘রাজাকার’ শব্দটি ব্যবহার করলে শিার্থীরা তীব্র ােভে ফেটে পড়েন। প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সেই রাতেই জন্ম নেয় ঐতিহাসিক স্লোগান ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলনের আগুন। সেই আগুন থেকেই জন্ম নেয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান।

সেই অভ্যুত্থানের পর দুই বছর হতে চলেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলায় একের পর এক আসামি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। ২০২৫ সালের ১১ জানুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রথমবারের মতো জামিন পান লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী। ২৬ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি একটি হত্যা মামলায় ছয় মাসের জামিন পান। তবে ৮ জুন ২০২৫ আপিল বিভাগ সেই জামিন স্থগিত করেন। চলতি জুন মাসের শুরুতে সবচেয়ে আলোচিত মুক্তিটি ঘটে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী হত্যাসহ ১২টি মামলায় জামিন পেয়ে ৩ জুন ২০২৫ কারামুক্ত হন। জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত ১৬ জুন ২০২৫ নীলতে হত্যা মামলায় জামিন পেয়ে ২১ জুন কারামুক্ত হন। সাবেক শিামন্ত্রী ডা: দীপু মনি ২৩ জুন ২০২৫ আরো তিনটি হত্যা মামলায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন, যা এখনো বিচারাধীন।

এক দিকে জামিনের স্রোত, অন্য দিকে নতুন মামলায় আটকÑ এই দুইয়ের মধ্যে শহীদ পরিবারগুলো এখনো ন্যায়বিচারের অপোয় দিন গুনছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি সংগ্রহকারী ও সাধারণ আলেমসমাজের সাধারণ সম্পাদক আকিফ আব্দুল্লাহ নয়া দিগন্তকে বলেন, সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী যে ১২টি মামলায় জামিন পেয়েছেন, তার মধ্যে ছিল স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী শহীদ পারভেজের হত্যা মামলাও। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের জালকুড়িতে ছাত্র আন্দোলনের সাথে একাত্মতা জানিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন পারভেজ। সেই মিছিলেই তিনি শহীদ হন। পরিবারের একমাত্র ছেলেকে হারানোর পর তার বাবা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন, মাও অসুস্থ। সংসারের হাল ধরেছেন পারভেজের বোনেরা। আকিফ আব্দুল্লাহ আরো জানান, নারায়ণগঞ্জে জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ৫৫ জন শহীদ হয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন ৬০০-এরও বেশি মানুষ। হেলিকপ্টার থেকে সবচেয়ে বেশি গুলি চালানো হয়েছিল এই অঞ্চলেই। অথচ এখন পর্যন্ত একটি হত্যারও বিচার হয়নি।

তিনি বলেন, যিনি ২৮ জুলাই ২০২৪ প্রকাশ্যে বলেছিলেন ‘এই আন্দোলন সন্ত্রাসীদের আন্দোলন’ সেই সাবেক মেয়র জামিনে মুক্ত। এমনকি একজন রাজনৈতিক কর্মীর হত্যা মামলা থেকেও তিনি জামিন পেয়ে গেছেন।

যাদের হারিয়েছি

জুলাই অভ্যুত্থানে শুধু তরুণ আন্দোলনকারীরাই নন, প্রাণ দিয়েছেন শিশু, রিকশাচালক, নববিবাহিত দম্পতি সমাজের একেবারে সাধারণ মানুষ। নিহতের সংখ্যা ১৪ শ’। তাদের মৃত্যু শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি জীবনের পেছনে আছে একটি করে বেদনার গল্প। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শহীদ হন রংপুরে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। ১৯ জুলাই রামপুরায় বিজিবির গুলিতে শহীদ হন মাত্র ১৪ বছর বয়সী ইফতি আব্দুল্লাহ। ২০১০ সালের ২৪ জুন জন্ম নেয়া এই কিশোরের মাথায় রাইফেলের বুলেট আঘাত করে। একই দিন মহাখালীতে রিকশা জমা দিয়ে বাসায় ফেরার পথে আন্দোলনে যোগ দেন রিকশাচালক গনি মিয়া। পুলিশের গুলি বুকে লাগলে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়, কিন্তু বাঁচানো যায়নি। একই দিন পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে কান্ত আন্দোলনকারীদের জন্য বিস্কুটের প্যাকেট খুলছিলেন কবি নজরুল কলেজের শিার্থী ইকরাম হোসেন কাউসার। সেই মুহূর্তেই পুলিশের গুলি তার মাথায় আঘাত করে। একই বুলেট বিদ্ধ হয় পাশে থাকা বুরহান উদ্দিন কলেজের নাদিমুল হাসান এলেমের চোখে। দু’জনেই ঘটনাস্থলে শহীদ হন। রক্তাক্ত রাস্তায় তখনও পড়ে ছিল অর্ধখোলা বিস্কুটের প্যাকেট।

২০ জুলাই ২০২৪ রায়েরবাগে শহীদ হন আব্দুর রহমান জিসান। মাত্র ১৪ মাস আগে বিয়ে হয়েছিল তাদের। স্বামীর মৃত্যুর পর জিসানের কাপড় গায়ে জড়িয়ে কাঁদতেন স্ত্রী রাবেয়া মিষ্টি, কিছু খেতেন না। স্বামীর মৃত্যু সইতে না পেরে ২৯ জুলাই জিসানের স্ত্রী রাবেয়া মিষ্টি আত্মহত্যা করেন। ৫ আগস্ট ২০২৪ আশুলিয়ায় পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ১৯ বছরের তানজিল মাহমুদ সুজয়কে। তার বোন ইসরাত জাহান বলেন, ‘আমার ভাইরে আমি ছুঁইতেও পারি নাই।’ আর ৪ আগস্ট ২০২৪ গাজীপুরে আনসারদের গুলিতে শহীদ হন ২০ পারা কুরআনের হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন। একটি সেলের ১৮০ থেকে ২০০টি ছররা গুলি তার শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মা একটি চিৎকার দিয়েছিলেন সেটাই ছিল তার শেষ স্বাভাবিক মুহূর্ত। এরপর থেকে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন।

এ দিকে নিজের বাবা কাবিল হোসেনকে জুলাই শহীদ প্রমাণের জন্য দিন পার করছে রেশমা বেগম। গেজেট হওয়ার পরও কোনো সহযোগিতা পায়নি তার পরিবার। রাজনৈতিক দল থেকেও কিছু মিলেনি। রেশমা বেগম বলেন, আমরা এখনো পাই নাই কোনো কিছু। একটু কাগজপত্র ঝামেলা। আমরা বিচার পাবো কোথায়? কে করবে বিচার এই প্রশ্ন রাখেন শহীদের কন্যা।