মালয়েশিয়া ও চীনে সরকারি সফর শেষ করে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফর। চীন সফর নিয়ে মানুষের আগ্রহ ছিল বেশি। বিশেষ করে প্রথম সফরে প্রতিবেশী ভারতে না গিয়ে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেয়ার বিষয়ে মহলবিশেষের সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করেন, এর মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দেশের প্রতি সুনির্দিষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগীর। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সম্প্রতি চীন প্রধান সহযোগী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা ক্ষেত্রে চীন ও বাংলাদেশের অবস্থান অভিন্ন। নিরাপত্তায়ও চীনের প্রত্যক্ষ সহায়তা আছে। সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশ চীন থেকে আসে। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও চীন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত অংশীদার। তবে বৈদেশিক প্রভাববলয় থেকে বেরিয়ে আসার অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কাছে বাংলাদেশের প্রত্যাশার ডালপালা অনেক বিস্তৃত। বাংলাদেশের নিরাপত্তা অবকাঠামোয় চীনা বিনিয়োগ ছাড়াও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আশাবাদ ছিল তুঙ্গে।
সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৩টি সমঝোতাস্মারকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদারের কথা বলা হলেও কোনো চুক্তি হয়নি।
বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় এবং বিদেশী হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে ঢাকার প্রতি বেইজিংয়ের সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বিশ্বে যত কিছু পাল্টাক, চীন-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের সম্পর্ক অটুট থাকবে। এই অঙ্গীকারের রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব নতুন করে উত্থাপন করেন তিনি। এটি নতুন ধারণা নয়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের এই প্রস্তাব ভারতের অনীহায় এগোতে পারেনি। এই প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ এতে মিয়ানমারে চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে সফর নিয়ে ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে, যা ইতিবাচক।
বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা জোরদার করবে চীন, যাতে বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা যৌথভাবে রক্ষা করা যায়।
বাংলাদেশী পণ্য রফতানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেয় চীন। এ জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। দু’পক্ষ যৌথভাবে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে সম্মত হয়।
মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার খোলার যে আশাবাদ ছিল সে বিষয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি। সংস্কৃতিবিষয়ক একটি সমঝোতাস্মারক স্বাক্ষর এবং সন্ত্রাস দমন ও পারস্পরিক বিনিয়োগ সম্প্রসারণে কয়েকটি দলিল বিনিময় হয়েছে। শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা নিরাশ হবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল্যায়নে সুনির্দিষ্ট চুক্তি স্বাক্ষর একমাত্র সূচক নয়। এ ধরনের সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। সে দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর তাৎপর্যপূর্ণ সন্দেহ নেই।