বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নিয়ে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। এখন নবজাতকরা জন্মই নিচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে। অনেক শিশুর জন্মের পরপর রক্তের কালচার করে দেখা গেছে, সেফট্রায়াক্সন, সেফটাজিডাইম ও সেফিক্সিম— এই তিন বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে আছে। অর্থাৎ এই তিন অ্যান্টিবায়োটিক শিশুটির শরীরে কাজ করবে ন। নয়া দিগন্তের খবরে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এখন হাসপাতালে সাধারণ অস্ত্রোপচারের ক্ষত শুকাতেও আইসিইউতে ব্যবহার করা উচ্চক্ষমতার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, দেশে প্রায় ৭৫ শতাংশ সংক্রমণে দায়ী ব্যাকটেরিয়াগুলোর বিরুদ্ধে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে গেছে। অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার জীবাণু সংক্রমণের বিরুদ্ধে সুস্থ হয়ে ওঠা কঠিন করে তুলছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ফলে রোগীর হাসপাতালে অবস্থানের সময় ও চিকিৎসার খরচ বাড়ছে। এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।

এর সোজা অর্থ হলো, সাধারণ কোনো ইনফেকশন বা রোগও অদূরভবিষ্যতে মহামারী বা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তখন আমাদের হাতে আর কোনো কার্যকর ওষুধ থাকবে না।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০— এই ১০ বছরে পৃথিবীতে ৪২টি অ্যান্টিবায়োটিক এলেও ১৯৯০-২০০০ সালের মধ্যে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক এসেছে ২১টি। ২০০০ সালের পর নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পরিমাণ একেবারে কমে গেছে। ২০০০-২০১০ সালের মধ্যে এসেছে মাত্র ছয়টি। ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ৯টি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক এসেছে। সেই তুলনায় জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। নতুন কোনো যুগান্তকারী অ্যান্টিবায়োটিক আসার সম্ভাবনা এখন প্রায় শূন্য।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ভয়াবহ সঙ্কটের পেছনে মূল কারণ দু’টি। এক. আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার অসচেতনতা ও তদারকির অভাব। দুই. সাধারণ মানুষের যত্রতত্র ওষুধ কেনার অবাধ স্বাধীনতা। বাংলাদেশে কোনো প্রকার রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেকোনো ফার্মেসি থেকে টাকা দিলে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায়। এর ওপর গ্রামীণ জনপদে হাতুড়ে ডাক্তারদের অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন এবং কোর্স সম্পন্ন না করার প্রবণতা এই সঙ্কট বাড়িয়ে তুলছে। এ ছাড়া হাসপাতালের বিছানা, আইসিইউ, এনআইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারগুলো নিয়মিত ও সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করা হয় না। এতে হাসপাতালগুলো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

আমরা মনে করি, অবিলম্বে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আইন অমান্যকারী ফার্মেসিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা জরুরি। একই সাথে হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার বন্ধে দেশব্যাপী জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা কোর্স অসমাপ্ত রেখে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা মানে নিজের ও নিজের অনাগত সন্তানের জীবন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ঠেলে দেয়া। তাই নিজেদের স্বার্থে এই অভ্যাস বদলাতে হবে। না হয় সাধারণ সর্দি-কাশিও ডেকে আনতে পারে মানুষের মৃত্যু।