গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে আবারো ইসরাইলি হামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় কামান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব গাজা সিটির একাধিক এলাকায় ভারী আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ করা হয়, যেসব এলাকা বর্তমানে ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরের উত্তরাংশেও গোলাবর্ষণ চালানো হয়েছে। খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে সামরিক যান থেকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। তবে এখন পর্যন্ত এসব হামলায় হতাহত হওয়ার কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী ধারাবাহিকভাবে এই চুক্তি লঙ্ঘন করে আসছে। ফিলিস্তিনি সূত্র অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৭৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ৩০১ জন আহত হয়েছেন।

এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৫৬২ জনে এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। অধিকাংশ হতাহতই নারী ও শিশু। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, ধারাবাহিক হামলার কারণে গাজায় মানবিক পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

গাজায় ২ লাখ ৩০ হাজার নারী ও কিশোরীর স্বাস্থ্যসেবা সঙ্কটে : জাতিসঙ্ঘ

গাজায় চলমান ইসরাইলি সামরিক সহিংসতার কারণে দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি নারী ও কিশোরী মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘ। এদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রয়োজনীয় প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। খবর আনাদোলু এজেন্সির। জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক বলেন, জাতিসঙ্ঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) সতর্ক করেছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, শিশুবিবাহ ও নারীদের শোষণের ঝুঁকি বেড়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও ক্লিনিক ধ্বংস হওয়ায় মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকার মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, বাস্তুচ্যুতি ও বন্যার প্রভাব পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। জাতিসঙ্ঘের অংশীদার সংস্থাগুলো গত কয়েক দিনে ১৩ হাজারের বেশি পরিবারকে সহায়তা পৌঁছালেও সক্ষমতা ও অর্থসঙ্কটের কারণে গাজার প্রায় ৯৭০টি বাস্তুচ্যুতি কেন্দ্রের মাত্র ৪০ শতাংশে সহায়তা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি অভিযানে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও ত্রাণ, ওষুধ ও আশ্রয়সামগ্রী প্রবেশে কড়াকড়ি থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রয়ে গেছে।

ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ

গাজায় যুদ্ধবিরতি জোরদার করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ চালু করেছেন। তবে এই বোর্ডের বিস্তৃত ক্ষমতা নিয়ে জাতিসঙ্ঘ ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খবর রয়টার্সের। ট্রাম্প বলেন, বোর্ডটি জাতিসঙ্ঘের সাথে সমন্বয় করে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে গাজার বাইরে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সঙ্কটেও ভূমিকা রাখবে। বোর্ডের স্থায়ী সদস্যদের প্রত্যেককে এক বিলিয়ন ডলার করে অর্থায়নের প্রস্তাবও দেন তিনি।

তুরস্ক, মিসর, সৌদি আরব, কাতার ও ইন্দোনেশিয়া বোর্ডে যোগ দিলেও ফ্রান্স ও ব্রিটেন এতে অংশ নেয়নি। চীন এখনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। রাশিয়া বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, বোর্ডের মূল লক্ষ্য হবে গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার জানান, পরবর্তী ধাপে গাজার পুনর্গঠন ও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বোর্ডে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই বোর্ড জাতিসঙ্ঘের ঐতিহ্যগত ভূমিকা দুর্বল করতে পারে।

গাজার শান্তি পর্ষদে যোগ দিতে কানাডাকে পাঠানো আমন্ত্রণ তুলে নিলেন ট্রাম্প

‘শান্তি পরিষদে’ যোগ দিতে কানাডাকে পাঠানো আমন্ত্রণ মার্কিন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে ট্রাম্প এ তথ্য জানিয়েছেন বলে গতকাল শুক্রবার সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে উদ্দেশ্য করে দেয়া পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এই চিঠির মাধ্যমে জানানো হচ্ছে, কানাডার যোগদান সংক্রান্ত আপনাকে পাঠানো শান্তি পর্ষদের আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করা হলো।’ কানাডার আমন্ত্রণ তুলে নেয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই ট্রাম্পের ‘শান্তি পরিষদের’ দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ফাঁকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। চলতি সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য দেন মার্ক কার্নি। থতিনি বলেন, ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেয়ার জন্য তার দেশ কোনো অর্থ দিতে পারবে না। আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব ব্যবস্থায় ভাঙন ধরেছে বলেও মন্তব্য করেন কার্নি।

এরপর বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে দেয়া দেয়া ভাষণে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেছেন, কানাডা বেঁচে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই। তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন কার্নিও। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার নতুন আইনসভার অধিবেশনের আগে কুইবেক সিটিতে এক ভাষণে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারণে নয়, কানাডা বেঁচে আছে কানাডিয়ানদের জন্যই। যদিও তিনি দুই দেশের (কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র) মধ্যে ‘অসাধারণ অংশীদারিত্বের কথা স্বীকার করেছেন। এরপরই গাজার বোর্ড পিসে যোগদানের জন্য কার্নিকে দেয়া আমন্ত্রণপত্র প্রত্যাহারের কথা জানান ট্রাম্প।

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ব্যাপক ধ্বংস, পুনর্গঠনে লাগবে ৭০ বিলিয়ন ডলার : জাতিসঙ্ঘ

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও গাজায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্থানীয় সূত্রগুলোর বরাতে টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, শুক্রবার ভোরে গাজা সিটি ও রাফাহর বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি কামান হামলা চালানো হয়। জাতিসঙ্ঘ বলছে, গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। জাতিসংঙ্ঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। তবে চলমান নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ত্রাণ প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় পুনর্গঠন কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ঠাণ্ডা মোকাবেলায় আবর্জনা খুঁড়ে প্লাস্টিক পোড়াচ্ছে গাজার মানুষ

গাজায় শীত ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। খান ইউনিসের মাওয়াসি এলাকায় মানুষজন খালি হাতে আবর্জনা খুঁড়ে প্লাস্টিক ও কাগজ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালাচ্ছে, যাতে ঠাণ্ডা থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়। খবর এপির। বাস্তুচ্যুত সানা সালাহ জানান, আগুন জ্বালানোই এখন পরিবারের টিকে থাকার একমাত্র উপায়। জ্বালানি বা কাঠ কেনার সামর্থ্য নেই তাদের। যদিও প্লাস্টিক পোড়ানো বিপজ্জনক, তবুও বিকল্প নেই। জাতিসঙ্ঘ জানায়, যুদ্ধবিরতির পর সহায়তা কিছুটা বাড়লেও জ্বালানি ও কাঠের তীব্র সঙ্কট রয়েছে। দুই কিশোরকে সম্প্রতি কাঠ সংগ্রহের সময় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। গাজার বাস্তুচ্যুতি শিবিরগুলোর মাত্র ৪০ শতাংশে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।

গাজায় এএফপির আলোকচিত্রী নিহত, তদন্তের দাবি

গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত এএফপির ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রী আবদেল রউফ শা’আতের মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি। ৩৪ বছর বয়সী এই সাংবাদিক নেটজারিম এলাকায় একটি গণমাধ্যমবাহী গাড়িতে হামলার শিকার হন। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। এএফপি জানায়, স্পষ্টভাবে ‘মিডিয়া’ চিহ্নিত গাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলা চালানো হয়। একই ঘটনায় আরো দুই সাংবাদিক নিহত হন। ফিলিস্তিনি গণমাধ্যম সংগঠনগুলো এ ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ বলে আখ্যা দিয়েছে। গাজা সরকারের মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৬০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহল সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ‘ইয়েলো লাইন’ এগিয়ে নিচ্ছে ইসরাইল : রয়টার্সের বিশ্লেষণ

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ইসরাইলি সেনাবাহিনী একতরফাভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণরেখা বা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ ভেতরের দিকে সরিয়ে নিচ্ছে বলে স্যাটেলাইট চিত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ডিসেম্বরে গাজা সিটির আল-তুফফাহ এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী কংক্রিট ব্লক বসিয়ে নিয়ন্ত্রণরেখা প্রায় ২০০ মিটার ভেতরে সরিয়ে নেয়। এর পরপরই অন্তত ৪০টি ভবন ধ্বংস করা হয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে খান ইউনিস ও রাফাহ এলাকাতেও, যেখানে বাস্তুচ্যুতদের জন্য স্থাপিত তাঁবু গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসরাইল গাজার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ছয়টি সামরিক দুর্গও নির্মাণ করেছে। এসব পদক্ষেপের ফলে হাজারো ফিলিস্তিনি আবারো এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। হামাসের এক মুখপাত্র বলেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাজার জনগণকে ক্রমেই পশ্চিমাঞ্চলের একটি সংকীর্ণ এলাকায় ঠেলে দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লড়াই বন্ধ ও সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ইসরাইল তার নিয়ন্ত্রণ আরো বিস্তৃত করছে।