চট্টগ্রামে গোলটেবিল বৈঠক
নির্বাচনী ইশতেহারে রোহিঙ্গাসহ জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ
Printed Edition
চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রামে এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুগুলো অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে। তারা বলেন, আসন্ন নির্বাচনে দলগুলোর পক্ষে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে স্পষ্ট বক্তব্য থাকা দরকার। রোহিঙ্গাদের কারণে বর্তমানে যে মানবিক, আর্থিক, সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যা চলছে, সামনের দিনগুলোতে এর সাথে যদি রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যা যুক্ত হয়, তা বাংলাদেশের জন্য বিরাট বিপদ তৈরি করবে। পাশেই পার্বত্য চট্টগ্রাম অস্থির এবং নানাবিধ সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের কারণে নাজুক। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ঘিরে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সমস্যার সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়টি কেবল মানবিক ত্রাণসহায়তার পরিসরে দেখার সুযোগ নেই। এ সমস্যার দীর্ঘসূত্রতা ও বিস্তারের সাথে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি ও বিভিন্ন মাত্রার চ্যালেঞ্জও অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। কাজেই প্রত্যাবাসন কেবল রোহিঙ্গাদের জন্যই নয়, বাংলাদেশের জন্যও স্বস্তিদায়ক বিষয়।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ, বাংলাদেশের (সিসিআরএসবিডি) উদ্যোগে সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাস বায়েজিদ আরেফিন নগরে হলরুমে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানবিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গোলটেবিল আলোচনার ধারণাপত্রে চবির প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, দলগুলোর উচিত জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামনে আনা। শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য লড়াই হলে গণতান্ত্রিক রূপান্তর নির্বিঘœ হতে পারবে না।
লিয়াকত আলী চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক প্রধান আলোচক প্রফেসর ড. মো: কামাল উদ্দিন, প্রোভিসি (প্রশাসন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ বিভাগীয় প্রধান, চবি রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক সিসিআরএসবিডি।
গোলটেবিল বৈঠকে অতিথি ছিলেন মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিএইচপি শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ, ড. মশিউর রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী , চট্টগ্রাম, উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) ড. শরীফ আশরাফউজ্জামান, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ইমন মোহাম্মদ, দফতর সম্পাদক, গণ অধিকার পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর, সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মারুফ (রুমী), সদস্য, রাজনৈতিক পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি, সাগুফতা বুশরা মিশমা, কেন্দ্রীয় সদস্য ও সংগঠক (এনসিপি), অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, চট্টগ্রাম মহানগরী। প্রফেসর মোহাম্মদ নুরুন্নবী, কর্মপরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, চট্টগ্রাম মহানগরীর, ড. মাসরুর হোসাইন, কর্মপরিষদ সদস্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, চট্টগ্রাম মহানগরী, একরামুল করিম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চট্টগ্রাম নগর কমিটি, বিএনপি।
সিসিআরএসবিডির পরিচালক প্রফেসর সরওয়ার জাহানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মো: নাজমুল ইসলাম চৌধুরী, পরিচালক, সিসিআরএসবিডি। এ ছাড়াও প্যানেল আলোচক ছিলেন অধ্যাপক ড. মো: এনায়েত উল্যা পাটওয়ারী, ডিন, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা কেন্দ্র, সভাপতি, ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক, চবি চ্যাপ্টার, কবি ওমর কায়সার সিনিয়র সাংবাদিক, কুমার সুই চিং প্র¤œ সাইন, চেয়ারম্যান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মং রাজা মং প্র¤œ সাইন ফাউন্ডেশন, প্রফেসর ড. জাহেদুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
বক্তারা আরো বলেন, সামগ্রিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরি ও চ্যালেঞ্জিং ইস্যু। আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এত বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে বহন করা বাস্তবসম্মত নয়। অপরদিকে, মিয়ানমারের সরকার আন্তর্জাতিক চাপে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চায়। কিন্তু এ সঙ্কট সমাধানে আঞ্চলিক জোট যেমন আসিয়ান বা বিমসটেক, তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। রোহিঙ্গা সমস্যাটি বাংলাদেশের জন্য বিশাল বোঝা হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দেশ এ নিয়ে নানা রকম পরিকল্পনা করেছে। এ পরিকল্পনার মধ্যে সমস্যাটিকে প্রলম্বিত করার মতলবও রয়েছে। তাতে দেশগুলোর নানা রকমের আর্থিক, বাণিজ্যিক ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তারা উল্লেখ করেন, ২০২৫ এর হিসাব অনুযায়ী, আট বছরে প্রায় চার লাখ জনসংখ্যা বেড়েছে ক্যাম্পগুলোতে। ক্যাম্পগুলোতে ২৪ ঘণ্টায় ১৩০-১৩৫ জন অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ছয়টি শিশুর জন্ম হচ্ছে, যা বছরে প্রায় ৫০ হাজার। ফলে প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য কূটনৈতিক বৈঠক, চুক্তি এবং আলোচনার পরও প্রত্যাবাসনের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
তারা বলেন, বস্তুত বাংলাদেশ যখন রোহিঙ্গা সঙ্কটের টেকসই সমাধানের জন্য একটি শক্তিশালী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, সে পরিস্থিতিতে সমস্যার নানামুখী বিস্তার ঘটছে। রোহিঙ্গাদের সাথে স্থানীয়দের দূরত্ব ও দ্বন্দ্বের মতোই ক্যাম্পে আশ্রিতদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে স্বার্থ ও মতাদর্শভিত্তিক দল, উপদল। স্থানীয় রাজনীতির শক্তিবৃদ্ধিতে তাদের ব্যবহার করার কিছু প্রচেষ্টার কথাও জানা যাচ্ছে। বিশেষত, সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে বসবাসকারী বর্তমান বাংলাদেশী ও সাবেক রোহিঙ্গা, যাদের পূর্বপুরুষ বেশ আগে আরাকান থেকে উচ্ছেদ হয়ে এসেছিল, তারা একটি উগ্র গোষ্ঠীগত, জাতিগত উত্তেজনা বৃদ্ধির চেষ্টা করছে।