আমিরাতে হামলায় আবার যুদ্ধের শঙ্কা উপসাগরীয় দেশগুলোতে
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশসীমায় ইরান থেকে ছোড়া একাধিক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। একই সময়ে ফুজাইরা বন্দরের একটি তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর সাম্প্রতিকতম হামলা এ অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করেছে। কাতার থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি আসাদ বেগ জানিয়েছেন, এ হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমিরাত দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে অন্তত একটি ড্রোন ফুজাইরা এলাকায় তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে। এতে সেখানে কর্মরত তিন ভারতীয় আহত হয়েছে।
আমিরাতের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ফুজাইরা একটি কৌশলগত জ্বালানি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে একযোগে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ে এ হামলা চালানো হয়েছে। গত এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সাথে ইরানের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর আমিরাতে এ হামলাই সবচেয়ে বড় উত্তেজনার ঘটনা। এর ফলে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। আমিরাত এ হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করলেও তেহরান এ পর্যন্ত দায় স্বীকার করেনি। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধের সময় অন্তত সাতটি আরব দেশ হামলার শিকার হয়েছিল। সে সময় আরব আমিরাতকে লক্ষ্য করেই ছোড়া হয়েছিল অন্তত ছয় হাজার ৪১৩ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এ অঞ্চলের কোনো দেশই এখন সেই ভয়াবহ যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি চায় না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাদের আবারো অনিচ্ছা সত্ত্বেও যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন সামরিক দুঃসাহসিকতা দায়ী : ইরান
আমিরাতের তেল শোধনাগারে হামলার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সামরিক কর্মকর্তা জানান, জ্বালানি স্থাপনায় কোনো ‘পরিকল্পিত’ হামলা চালানো হয়নি; বরং উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য তিনি ওই অঞ্চলে ‘মার্কিন সামরিক দুঃসাহসিকতাকে’ দায়ী করেছেন। খবর আলজাজিরার। এ দিকে হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘যদি হরমুজ প্রণালীতে কোনো মার্কিন নৌ জাহাজের ওপর হামলা চালানো হয়, তবে ইরানকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হবে।’ মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এ সময় তাদের কাজে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে বেশ কয়েকটি ইরানি ছোট নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে মার্কিন নৌবাহিনী। পুরো অঞ্চল যখন যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, তখন কিছুটা নমনীয় সুর শোনা গেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির কণ্ঠে। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীর ঘটনাগুলো এটিই প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সঙ্কটের কোনো সামরিক সমাধান নেই। তিনি আরো জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি শান্ত করতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে এবং তাতে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় দেশটির শীর্ষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে নৌপরিবহন ও জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। খবর বিবিসির। সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ শুরুর পর ফারসি ভাষায় এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে থ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ এবং হরমুজ প্রণালীতে ‘অবরোধ আরোপের’ অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং অবরোধের মাধ্যমে নৌপরিবহন নিরাপত্তা এবং জ্বালানি সরবরাহকে বিপন্ন করেছে। তবে তাদের এই অশুভ কর্মকাণ্ড ব্যর্থ হবে। তিনি বলেন, আমরা ভালো করেই জানি যে স্থিতাবস্থার ধারাবাহিকতা আমেরিকার জন্য অসহনীয়, আর আমরা তো সবে শুরু করেছি। এ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে একটি পথ আবার খোলার চেষ্টায় থাকা মার্কিন জাহাজে হামলা করলে ইরানকে ‘পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা’ হবে। পারস্য উপসাগরে নাবিকসহ আটকে পড়া শত শত জাহাজকে সাহায্য করতে যুক্তরাষ্ট্র সোমবার একটি অভিযান শুরু করেছে, যা এ অঞ্চলকে আবার একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
তেহরান এই প্রণালীর ওপর তাদের অবরোধ আবার আরোপ করতে চেয়েছিল, যা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী সাতটি ইরানি ছোট নৌকা ধ্বংস করার এবং ইরানি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উভয়ই আটক করার দাবি করেছে। তবে ইরান তা অস্বীকার করেছে।
আলোচনায় বসতে নতুন শর্ত ইরানের
যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত ইরান। তবে শর্ত হলো ওয়াশিংটনকে তেহরান-সংক্রান্ত তাদের দাবিগুলো কিছুটা শিথিল করতে হবে। সোমবার বিষয়টি স্পষ্ট জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকেই। খবর আলজাজিরার। টেলিভিশনে দেয়া এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমাদের প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধের সমাপ্তি। অন্য পক্ষকে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান নিতে হবে এবং ইরানকে ঘিরে অতিরিক্ত দাবিগুলো পরিত্যাগ করতে হবে।’ বাকেই বলেন, এত দিনে আমেরিকার বোঝা উচিত হুমকি ও শক্তির ভাষা ব্যবহার করে তারা ইরানি জাতির সাথে আচরণ করতে পারে না। তিনি বলেন, ইরান নিজেকে হরমুজ প্রণালী ও এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের রক্ষক হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি আরো বলেন, সঙ্ঘাত শুরুর আগে এই পথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ ছিল। ইসরাইলকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এই নৌপথে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং বিশ্বজুড়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নিস্ট শাসনকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ট্রাম্পের এসকর্ট পরিকল্পনা ঘোষণার আগেই বাকেই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, যুদ্ধের অবসানকে কেন্দ্র করে তেহরান ১৪ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র এর জবাব দিয়েছে।
হরমুজে যাত্রীবাহী নৌকায় মার্কিন হামলায় নিহত ৫
হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে পাঁচজন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে ইরান। তারা জানায়, মার্কিন বাহিনী ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌযান নয়, বরং যাত্রীবাহী ছোট নৌকায় হামলা চালিয়েছে। ইরানের এ বক্তব্য মার্কিন অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি দাবি করেছিলেন, সেন্ট্রাল কমান্ডের বাহিনী হরমুজ প্রণালী থেকে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনার অভিযানে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে আইআরজিসির ছয়টি নৌযান ডুবিয়ে দেয়া হয়। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সংখ্যা সাতটি বলে উল্লেখ করেন। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে এবং আবারো যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি এক অজ্ঞাতনামা সামরিক কমান্ডারের বরাতে জানিয়েছে, আইআরজিসির নৌযানে হামলার মার্কিন দাবির পর তেহরান একটি তদন্ত শুরু করে। তদন্তে দেখা গেছে, আইআরজিসির কোনো নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং সোমবার ওমানের উপকূলের খাসাব থেকে ইরানের উপকূলের দিকে যাত্রা করা দু’টি ছোট নৌকায় মার্কিন বাহিনী হামলা চালায়। ওই হামলায় নৌকাগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং পাঁচজন বেসামরিক যাত্রী নিহত হন বলে ওই কমান্ডার জানান। তিনি বলেন, এই অপরাধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।