প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ টিআইবির

প্রার্থীদের ৪৮.৪৮ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রায় অর্ধেক প্রার্থীর পেশা হচ্ছে ব্যবসা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতীক পেয়ে গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নেমেছেন। ভোটের রাজনীতিতে প্রার্থীর বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি এখন ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা। মনোনয়নপত্রের সাথে জমা দেয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যেখানে নির্বাচনী প্রতিযোগিতার আড়ালে থাকা অর্থ ও প্রভাবের বাস্তবতা স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন ৫৬০ জন। শত কোটি টাকার মালিক প্রার্থী রয়েছেন সংখ্যা ২৭ জন।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি : ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন টিআইবির কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রার্থীদের সম্পদের পাশাপাশি দ্বৈত নাগরিকত্ব ও তথ্য গোপনের গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেয়া ২১ জন প্রার্থী হলফনামায় দ্বৈত নাগরিকত্ব ত্যাগের তথ্য দিয়েছেন। কিন্তু টিআইবির কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য রয়েছে-কমপক্ষে দুইজন প্রার্থী তাদের দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করেছেন। ওই দুই প্রার্থী ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন বা এখনো আছেন, অথচ হলফনামায় বিষয়টি উল্লেখ করেননি। টিআইবির নীতিমালার কারণে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য হস্তান্তর করা হবে বলে জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, একজন প্রার্থীর নির্ভরশীলের নামে ইংল্যান্ডে প্রায় ২১০ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও তা হলফনামায় প্রকাশ করা হয়নি। আরেক প্রার্থী নিজে ও তার স্ত্রীর নামে বিদেশে কোনো সম্পদ নেই বলে ঘোষণা দিলেও অনুসন্ধানে দুবাইতে তার স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একজন প্রার্থী বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাট থাকার কথা জানালেও বাস্তবে সেই সংখ্যা কমপক্ষে তিন গুণ এবং বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা নেই বলে দাবি করলেও অনুসন্ধানে তার সংশ্লিষ্ট ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে, যার মধ্যে আটটি সক্রিয় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত।

ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, একজন প্রার্থীর করস্বর্গে কোম্পানি নিবন্ধনের পুরোনো তথ্য প্রকাশ্যে থাকলেও হলফনামায় এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এসব উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রার্থীদের মধ্যে ৪৮.৪৮ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা। আইন পেশা ১২.৬১ শতাংশ ও শিক্ষক ১১.৫৬ শতাংশ। পেশা হিসেবে রাজনীতি দেখিয়েছেন ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার প্রার্থীদের মধ্যে ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েছে। তবে বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলের বিতর্কিত নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থীর হার এর চেয়ে আরো বেশি ছিল।

১০০ কোটি টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদ আছে এমন প্রার্থীর সংখ্যা ১৩ জন (১.৩৯ শতাংশ), ৫০-১০০ কোটি টাকার মধ্যে সম্পদ রয়েছে এ হারও ১.৩৯ শতাংশ। ১০-৫০ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক ৬.৬৪ শতাংশ, এক কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক ৩১.৭৩ শতাংশ। আর এক কোটি টাকার নিচে অস্থাবর সম্পদের মালিক ৫৮.৮৪ শতাংশ। কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা ৫৬০ জন। এর মধ্যে বিএনপির ২১২ জন (৭১.৮৬ শতাংশ), জামায়াতে ইসলামীর ৫৩ জন (১৯.৮৫ শতাংশ), ইসলামী আন্দোলনের ২৭ জন (১১.৯৫ শতাংশ), জাতীয় পার্টির ২৭ জন (১৮.৪৯ শতাংশ). গণ অধিকার পরিষদের ছয়জন ও এনসিপির ছয়জন।

প্রতিবেদনে উঠে আসে এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। সবচেয়ে বেশি ২৮৮ আসনে প্রার্থী দিয়েছে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। এরপর রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ২৫৩টি। জামায়াতে ইসলামী ২২৪ জন (নির্বাচন করবে না আরো কয়েকটিতে), জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছে ১৯২ জন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৪৯ জন। নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলেও কিছুটা বেড়েছে, ৪.০২ শতাংশ। ২০০৮ সালে এ হার ছিল ৩.১৩ শতাংশ। বিএনপি জোটে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ২৪ জন। আর জামায়াত জোটে প্রার্থী ছয়জন।

মোট দুই হাজার ২৮৮ জন প্রার্থীর বয়স বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২৫-৩৪ বছরের মধ্যে রয়েছেন-২০৫ জন, ৩৫-৪৪ বছর পর্যন্ত ৪১৪ জন, ৪৫-৫৪ বছর পর্যন্ত ৬৫১ জন, ৫৫-৬৫ বছর বয়সী ৫৩১ জন, ৬৫ বছরের বেশি ৩৭৮ জন এবং বয়স উল্লেখ নেই এ রকম সংখ্যা ১০৯ জন। এবারই প্রথম নির্বাচন করছেন, এমন প্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৬৯৬ জন।

মোট প্রার্থীর মধ্যে ৭৬.৪২ শতাংশ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ ৮.৯৪ শতাংশ। মাধ্যমিক পাস ৬.৫৪ শতাংশ, স্বশিক্ষিত ৫.৬৩ শতাংশ, নিম্ন-মাধ্যমিক ২.৩২ শতাংশ এবং স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন ০.৭৭ শতাংশ। বিগত পাঁচটি নির্বাচনের তুলনায় এবার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেশি।

প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, দলগুলোর মধ্যে ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থীর হার বিএনপিতে সবচেয়ে বেশি, ৫৯.৪১ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে স্বতন্ত্র ৩২.৭৯ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ২৬.৯৭ শতাংশ সিপিবি ২৫ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামী ২২.২৬ শতাংশ। শীর্ষ ১০ দায়গ্রস্ত প্রার্থীর মধ্যে ৯ জনই বিএনপির, একজন স্বতন্ত্র।

কৃষি জমির মালিক প্রার্থীর মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন-বিএনপির চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী মো আলী আব্বাস। কৃষি ও অকৃষি মিলে তার মোট জমির পরিমাণ এক হাজার ২৯০ একর। দ্বিতীয় কৃষি জমির মালিক জামায়াতে ইসলামীর দিনাজপুর-৫ আসনের প্রার্থী মো: আনোয়ার হোসেন, প্রায় ২৩৭ একর।