চলতি অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্য ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
গতবার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও চলতি অর্থবছরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রত্যাশা নিয়ে রফতানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৩.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ছয় হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। এর মধ্যে পণ্য খাতে ৫৫.২ বিলিয়ন ডলার বা পাঁচ হাজার ৫২০ কোটি ডলার ও সেবা খাতের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বা ৮২০ কোটি ডলার। গতকাল রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণবিষয়ক সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
বিদায়ী ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু বছর শেষে প্রকৃত রফতানি আয় দেশে এসেছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানি আয় কম হয়েছে সাত বিলিয়ন ডলার। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি মাইনাস শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ (-০.৫৮ শতাংশ)।
গত অর্থবছরে রফতানি খাতে প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জিত না হলেও এবার বাড়ানো হলো কেন? এটি কি লোকদেখানো? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ভালো প্রশ্ন। আপনি ঠিকই বলেছেন। এর একটি কারণ গত অর্থবছরে অনেক অনিশ্চয়তা ছিল। ব্যবসা তার প্রসারের জন্য একটা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ চায়। তখন একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল। ‘পলিসি স্ট্যাবিলিটি’, ‘পলিসি প্রেডিক্টিবিলিটি’, এই অনিশ্চয়তার ধাপগুলো পেরিয়ে এখন একটা নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ‘সো, পলিসি প্রেডিক্টিবিলিটি’ এখন আরো বাড়বে।
এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরে অর্থনীতির বাধাগুলো দূর করার, ব্যবসাবাণিজ্য প্রসারের জন্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে প্রথম দিন থেকেই সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে বাণিজ্যমন্ত্রী দাবি করেন।
তিনি বলেন, নতুন সরকারের বিভিন্ন ব্যবসাবান্ধব উদ্যোগ, ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং একাধিক দেশের সাথে মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা এগিয়ে যাওয়ায় আগামী অর্থবছরে রফতানিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাবে বলে আশাবাদী।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান দু’টি যুদ্ধ এবং উন্নত দেশগুলোতে ভোগ ও চাহিদার প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। এ ধরনের প্রতিকূলতা থাকলেও সরকার গত বাজেটে রফতানিমুখী ব্যবসাকে উৎসাহিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যবসা শুরু ও পরিচালনায় বিভিন্ন প্রক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে, যাতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয় এবং এর ইতিবাচক প্রভাব দ্রুত রফতানি খাতে প্রতিফলিত হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, রফতানিকারকদের সহায়তায় সরকার আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, যার সুফল বিদেশী ক্রেতারাও দ্রুত দেখতে পাবেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার আশা রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সাথেও শিগগির এফটিএ চূড়ান্ত হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে আরো চার থেকে পাঁচটি দেশের সাথে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আমাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। তারা ইতোমধ্যেই আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, তারা এফটিএ করতে চায় এবং সেজন্য আলোচনা শুরু হবে অতি দ্রুত।
তিনি আরো বলেন, এই যে অনেকগুলো গ্রিন সিগন্যাল যে বাংলাদেশ বিশ্বের জন্য একটা কাক্সিক্ষত ব্যবসার পার্টনার, গ্লোবাল বিজনেস পার্টনার, গ্লোবাল ইকোনমিক পার্টনার, এই বার্তাটা অনেক ইম্পর্টেন্ট তাদের আস্থার জন্য। তো সেটার প্রতিফলন আগামী দিনে ইনশাআল্লাহ আপনারা দেখতে পাবেন।’
তিনি বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সরকারি সহায়তা সব মিলিয়ে আগামী দিনে রফতানি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর মার্কিন শুল্ক পরিস্থিতিতে বাস্তবিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। প্রথমে ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক (রেসিপ্রোকাল) শুল্ক ঘোষণা করা হলেও পরে তা ১৯ শতাংশে নামানো হয়। পরবর্তীতে মার্কিন উচ্চ আদালতের এক রায়ের পর সেটি বাতিল হয়ে যায়।
তিনি বলেন, এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেকশন ১২২-এর অধীনে ব্যালান্স অব পেমেন্টের কারণ দেখিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পান, যা সর্বোচ্চ পাঁচ মাস কার্যকর থাকতে পারে এবং পরে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সেকশন ৩০১-এর আওতায় শ্রম-সংক্রান্ত ইস্যুতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাস্তবে করের হারে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের ১০ শতাংশ শুল্কের জায়গায় নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে একই ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল রয়েছে। এটি কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, প্রায় ৬০টি দেশের ওপর একই ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যও রয়েছে। তাই নতুন করে বাংলাদেশের রফতানির ওপর অতিরিক্ত কোনো প্রভাব পড়বে না।