৬ ব্যাংকে বিশেষ তদন্ত

ট্রেজারি ও আইটি অনিয়ম উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের : বিদেশে ডলার পাঠালেও গ্রাহকের নামে তৈরি হয়নি ঋণ; তথ্য গায়েবের নেপথ্যে ট্রেজারি বিভাগ

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
first-1
৬ ব্যাংকে বিশেষ তদন্ত

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যাংকিং রীতি অনুযায়ী, কোনো আমদানিকারক বা গ্রাহক বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) স্থাপন করেন। পণ্য দেশে আসার পর গ্রাহকের সম্মতির ভিত্তিতে বিদেশী ব্যাংকগুলোর সাথে লেনদেনের জন্য বিদেশে থাকা দেশী ব্যাংকগুলোর ব্যাংকিং ভাষায় ‘নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট’ নামে পরিচিত নিজস্ব হিসাব থেকে সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার পরিশোধ করা হয়। একই সাথে দেশী ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের নামে সমপরিমাণ টাকা ঋণ (দায়) হিসেবে সৃষ্টি করা হয় এবং গ্রাহক সেই পণ্য খালাস ও বিক্রি করে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করেন।

কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত গুরুতর কিছু অভিযোগ পেয়েছে, যেখানে দেখা গেছে আমদানির বিপরীতে বিদেশী ব্যাংকগুলোকে নস্ট্রো অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ডলার পরিশোধ করা হলেও, দেশী ব্যাংকে গ্রাহকের নামে কোনো ঋণ বা দায় সৃষ্টি করা হয়নি। ব্যাংকিং রীতি অনুযায়ী এটি যেমন গুরুতর অপরাধ, তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর আইটি সিস্টেম থেকে এই সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মুছে ফেলারও অভিযোগ উঠেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি ও আইটি বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এই চক্রের সাথে সরাসরি জড়িত। ট্রেজারি বিভাগে এ ধরনের আর কী পরিমাণ তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে এবং এর আড়ালে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকরা বিদেশে টাকা পাচার করেছে কি না, তা উদঘাটনে এবার বিশেষ চিরুনি অভিযানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রথম দফায় টার্গেটে রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশী ৬ ব্যাংক

এই চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ও তথ্য গায়েবের রহস্য উদঘাটনে প্রথম দফায় নির্দিষ্ট ছয়টি ব্যাংককে বেছে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলো হলো- রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংক; বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক এবং বিদেশী খাতের এইচএসবিসি।

এই ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি ও আইটি বিভাগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্তের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ছয়টি পৃথক বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এর মধ্যে পরিদর্শন বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তা রয়েছে। এজন্য কীভাবে ব্যাংকগুলোকে পরিদর্শন করা হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গাইড লাইন দেয়া হয়েছে তদন্ত দলের সদস্যদের।

ওভার ও আন্ডার ইনভয়েজিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তার বেশির ভাগই ঘটে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে। আমদানির ক্ষেত্রে ১০০ টাকার পণ্য ৫০০ টাকা দেখিয়ে অতিরিক্ত ৪০০ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়, যাকে বলা হয় ওভার ইনভয়েজিং। অন্য দিকে, রফতানির ক্ষেত্রে এক হাজার টাকার পণ্য ২০০ টাকা দেখিয়ে বাকি ৮০০ টাকা বিদেশেই রেখে দেয়া হয়, যা আন্ডার ইনভয়েজিং নামে পরিচিত। এভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা শত শত কোটি টাকা পাচার করে আসছেন।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিল, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যার বড় অংশই গেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে।

আগের তদন্তেও মিলেছে অর্থপাচারের প্রমাণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত ও বিশেষ তদন্তগুলোতেও বিভিন্ন সময় অর্থপাচারের এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সুকৌশলে টাকা পাচারের অকাট্য প্রমাণ পেয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শেখ হাসিনাসহ সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবার এবং ব্যাংক লুটেরা এস আলম গ্রুপসহ ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলার পর, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

তারই ধারাবাহিকতায়, এবার আমদানির দায় পরিশোধের পরও গ্রাহকের নামে ঋণ সৃষ্টি না করা এবং ডিজিটাল তথ্য গায়েব করার মতো নতুন ও ভয়ঙ্কর কৌশলের সন্ধান পাওয়ায় এই ছয় ব্যাংকে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদন্ত দল।

আটটি খাত নিয়ে অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কিছু কিছু ব্যাংকের আইটি খাত নিয়েও অভিযোগ ওঠেছে। একটি বিশেষ প্রতিবেশী দেশ থেকে বিভিন্ন সফটওয়্যার কেনা হয়েছে। একই সাথে ওই দেশের জনবল দিয়ে এসব সফটওয়্যার পরিচালনা করা হচ্ছে। একদিকে সার্ভিসের নামে কোটি কোটি ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে, অপরদিকে দেশের গ্রাহকদের তথ্য পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসব সফটওয়্যার কারা সরবরাহ করেছে, কী কী শর্তে এসব সফটওয়্যার আনা হয়েছে, সার্ভিসের নামে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে সে বিষয়ে খতিয়ে দেখা হবে। একই সাথে এসব সফটওয়্যারের কতটুকু সুরক্ষিত, গ্রাহকের তথ্য কতটা নিরাপদ এসব দিকগুলো খতিয়ে দেখা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ট্রেজারি বিভাগ ও আইটি বিভাগের মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। এর সঠিক হিসেব বের করার জন্যই প্রাথমিকভাবে ৬টি ব্যাংক বেছে নেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য ব্যাংকগুলোতেও একইভাবে তদন্ত করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকের হিসাব পরিচালনা, ডলার পরিশোধ ও বৈদেশিক তারল্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে। বিদেশী ব্যাংকে অর্থ পরিশোধের প্রতিটি ধাপ এই বিভাগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। গ্রাহকের নামে দায় সৃষ্টি না করার অর্থ হলো ব্যাংকের প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা পাচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট, এলসি নিষ্পত্তির রেকর্ড, ট্রেজারি এন্ট্রি, গ্রাহক হিসাব এবং বৈদেশিক মুদ্রার সমন্বয় পরীক্ষা করবেন। এবারের তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যাংকগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ। কিছু ব্যাংকে লেনদেনের তথ্য মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করার অভিযোগের অর্থ হলো শুধু আর্থিক নথি নয়, ডিজিটাল রেকর্ডও ফরেনসিকভাবে পরীক্ষা করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকের সার্ভার লগ, ব্যবহারকারীর কার্যক্রম, সফটওয়্যারের পরিবর্তনের ইতিহাস, ব্যাকআপ ডেটা এবং তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হবে। কোনো তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছে কি না কিংবা লেনদেন গোপন করার চেষ্টা হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।

ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের জন্য নয়, পুরো আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক হবে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ে আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছ হিসাব, নির্ভুল তথ্য সংরক্ষণ এবং যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে এলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক লেনদেন আরও কঠোর নজরদারির আওতায় আসবে। একই সঙ্গে ট্রেজারি কার্যক্রমে অটোমেশন, রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল অডিট ট্রেইল সংরক্ষণ এবং তথ্য নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।