ঈদে থাকুন স্বাস্থ্য সচেতন
Printed Edition
ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু
রমজানের দীর্ঘ এক মাস রোজা পালনের পর খুশির বার্তা নিয়ে আসে ঈদ। কিন্তু বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনেকেই খুশির আয়োজন থেকে বাদ পড়েন। এ অসুস্থতা কিন্তু অনেকটাই নিজের হাতে তৈরি করা। একটু সচতন হলে কিন্তু ঈদের সময়টা সুস্থ থেকে আনন্দে কাটানো যায়। এক মাস রোজা পালনের পর ঈদের দিন চলে পেটভরে খাওয়া-দাওয়া। বন্ধু-বান্ধবের বাসায় গেলে তো আর কথাই নেই। এক মাস খাওয়া-দাওয়ায় সংযম পালনের পর হঠাৎ অধিক খানাপিনা করলে পেটকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়। দেখা দেয় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা। এর মধ্যে বুকজ্বলা অন্যতম। এ থেকে মুক্তি পেতে ভাজা-পোড়া খাবার পরিহার করুন। বন্ধুর অনুরোধে পায়েশ, সেমাই, ফিরনি, জর্দ্দা খেলে বুক জ্বলা থেকেও মুক্তি পেতে পারেন, সাথে রক্ষা হলো বন্ধুর মনও। বন্ধুর মন রক্ষা করতে গিয়ে এগুলো আবার অতিরিক্ত খাবেন না। যদি আলসারের সমস্যা থাকে তবে আগে থেকেই ওমিপ্রাজল খেতে পারেন। বুক জ্বলা থেকে রক্ষা পেতে বেশি করে পানি পান করুন। খাবার পরপরই পানি পান করবেন না।
রান্না করা খাবার বেশিক্ষণ রাখবেন না। রেস্টুরেন্টে খাবার তো একবারই নয়। দুধ খেলে যাদের সমস্যা দেখা দেয় তারা দুধ দিয়ে রান্না করা সেমাই, পায়েশ, ফিরনি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। খেতে পারেন দুধ ছাড়া সেমাই, ফিরনি।
ডায়াবেটিস আক্রান্তরা তো সারাজীবন সংযম পালনেই অভ্যস্ত। এটিও বজায় থাকুক ঈদে। ঈদের খাবারগুলো তো মিষ্টি দিয়ে রান্না করা হয়, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। তবে স্যাকারিন বা অ্যাকারবাজ দিয়ে রান্না হলে খেতে পারেন অনায়াশেই। এগুলো খাবার মিষ্টি করলেও আপনার রক্তে গ্লুকোজ কিন্তু বাড়াবে না। যারা ইনসুলিন নেন তাদের রক্তে গ্লুকোজ খুব দ্রুত ওঠা-নামা করে, এজন্য খাবারে কোনোভাবেই অনিয়ম করা যাবে না। রোজাকালীন আপনার ইনসুলিন ও ট্যাবলেটের কমিয়ে দেয়া ডোজ ঠিক করে নিন চিকিৎসকের পরামর্শমতো। ঈদের পর বেশি বেশি করে গ্লুকোজ পরীক্ষা করুন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন। শুধু মিষ্টিজাতীয় খাবার আপনার জিহ্বা যেন বাধা না হয়, এটি হোক চর্বি জাতীয় খাবারেও।
হার্টের রোগীদের জন্য ঈদে তেমন বাধা-নিষেধ নেই। তবে যেটি খেয়াল রাখতে হবে, একসাথে অতিরিক্ত খাবেন না। একবার বেশি পরিমাণে খেলে আপনার বুকে ব্যথা হতে পারে। অল্প অল্প করে বারবার খেতে পারেন। চর্বিজাতীয় খাবার, ভাজা-পোড়া, রিচ ফুড খাবেন না। বেশি ভিড়ের মধ্য না যাওয়াই ভালো। সাথে ডায়াবেটিস থাকলে মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিহার করুন। কিডনি রোগীদের ঈদের ঐতিহ্যবাহী খাবারে তেমন সমস্যা নেই। তবে আপনারা ভাজা-পোড়া খাবার থেকে বিরত থাকুন। গোশত ও আমিষজাতীয় খাবারে হন সতর্ক। ডায়াবেটিসের কারণে কিডনির সমস্যা হলে মিষ্টিজাতীয় খাবার থেকে দূরে থাকুন।
গর্ভবতী মায়েরা বেশি পরিমাণ মিষ্টিজাতীয় খাবার খাবেন না। গুরুপাক খাবেন না। একবারে বেশি পরিমাণে খাবেন না। যে খাবারগুলো সহজেই হজম হয় অল্প অল্প পরিমাণে বারবার খান। সময়মতো খাবেন। ঈদে আপনার হাতে রান্না ছাড়া বাসার অন্যের জিহ্বার রসনা মিটবে না। তাতে সমস্যা নেই। আপনিও রান্না করতে পারেন। তবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন না। বসে বসে রান্না করতে পারেন। কিন্তু বেশিক্ষণ রান্নাঘরে থাকবেন না। শ্বাসকষ্টে ভুগছেন এমন রোগীরা খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হন। গরু, হাঁসের গোশত, হাঁসের ডিম, ইলিশ মাছ, বেগুন, নারিকেল, আনারস, পাকা কলায় হতে পারে অ্যালার্জি। এ থেকে বাড়তে পারে আপনার শ্বাসকষ্ট। একবারে অনেক বেশি খেয়ে ফেললে বাড়তে পারে শ্বাসকষ্ট।
ঈদের দিন বন্ধুবান্ধব নিয়ে চলে জম্পেশ আড্ডা। সারাদিন ছোটাছুটি। গরমে ঘেমে গিয়ে আপনি আক্রান্ত হতে পারেন হাঁচি-কাশিতে। ঘেমে গেলে সাথে সাথে ঘাম মুছে ফেলুন। টাইট, মোটা কাপড় না পরে সুতি-ঢিলেঢালা জামা-কাপড় পরলে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে। ঈদের দিন বৃষ্টি হলে মনের আনন্দে না ভেজাই বুদ্ধিমানের কাজ।
যারা ঈদে বাড়ি যাচ্ছেন যাত্রাপথে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে ভ্রমণ করবেন না। ছোট শিশুদের দিকে খেয়াল রাখুন। বাড়ির আশপাশে পুকুর-ডোবা থাকলে শিশুদের কিছুতেই একা ছাড়বেন না। আপনি নিয়মিত যে ওষুধ সেবন করেন তা পর্যাপ্ত পরিমাণ সাথে নিন। সাথে রাখুন নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। সাথে আপনার পরিচিত চিকিৎসকের মোবাইল নম্বর। ঈদে হতে পারে বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখ। তাই বলে অসুখের ভয়ে তো আর ঈদের আনন্দ মাটি করা যায় না। সেটি ঠিকও নয়, আমাদের গরিব দেশে আনন্দের দিন আসেইবা কয়টি। একটু সচেতনভাবে চলুন। ঈদ কাটুক আনন্দ, হাসি-গানে। সবার জন্য শুভ কামনা।