হাজিরা দিয়ে শিক্ষকরা উধাও, কাউখালীর প্রাথমিকগুলোতে অনিয়ম
Printed Edition
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা
- উপস্থিত শিক্ষার্থী বেশি দেখিয়ে বরাদ্দকৃত খাবার আত্মসাৎ
- ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালু ও নিয়মিত মনিটরিং দাবি
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক শ্রেণীর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা ও কোচিং বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর দিয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ, নিয়মিত ক্লাস না নেয়া এবং শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে নির্ভরশীল করে তোলার মতো কর্মকাণ্ডে প্রাথমিক শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবক ও স্থানীয়দের।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক শিক্ষক বিদ্যালয়ে উপস্থিতি খাতায় স্বাক্ষর করলেও পরে ব্যক্তিগত কাজে চলে যান। এতে অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক অনুপস্থিত থাকায় পাঠদান বন্ধ থাকে। কোনো কোনো শ্রেণীতে মাত্র একজন শিক্ষার্থী নিয়েই ক্লাস চলছে, আবার কোনো কোনো ক্লাসে একজন শিক্ষার্থীও নেই। স্কুলটিতে এমন চিত্র মাঝে মধ্যেই দেখা গেছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠে আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং উপস্থিতির হারও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
সরেজমিন জানা গেছে, উপজেলার জব্দকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র সাতজন। এ ছাড়া আরো অন্তত ১০টি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে তা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত খাবার বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে উপস্থিত শিক্ষার্থীর তুলনায় বেশি দেখিয়ে বরাদ্দকৃত খাবার আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করে নেয়া হচ্ছে।
অন্য দিকে, কিছু শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার জন্য নানা অজুহাতে তারা মেডিক্যাল সনদ দাখিল করছেন। একই সাথে শহরমুখী শিক্ষকদের একটি অংশ বিদ্যালয়ের পাঠদানে গুরুত্ব কমিয়ে ব্যক্তিগত কোচিং ও প্রাইভেট শিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কোচিং পরিচালনা করছেন বলে অভিভাবকদের অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক জানান, কোচিংয়ে না গেলে পরীক্ষায় ভালো ফল করা কঠিন- এমন ধারণা তৈরি করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ফলে বাধ্য হয়েই সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাতে হচ্ছে। এতে এক দিকে শিক্ষার্থীদের উপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্য দিকে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতির কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। বিপরীতে কিন্ডারগার্টেন ও নূরানী মাদরাসায় ভর্তির হার বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শিক্ষার মান অবনতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যালয় পরিদর্শন প্রসঙ্গে স্থানীয়রা জানান, মাঝে মধ্যে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা পরিদর্শনে এলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় না। ফলে অনিয়মগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নজরদারির বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
সচেতন মহলের দাবি, পরিস্থিতি উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। তারা ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালু, নিয়মিত মনিটরিং জোরদার এবং অনিয়মে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং কোচিং নির্ভরতা কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোল্লা বখতিয়ার হোসেন বলেন, অভিযোগগুলো উদ্বেগজনক। বিষয়টি তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আসাদুজ্জামান জানান, বিদ্যালয়গুলোতে মনিটরিং জোরদার করা হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।