পরিবেশ রক্ষায় দলগুলোকে ইশতেহারে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে হবে : পরিবেশ উপদেষ্টা

Printed Edition
back-4
রাজধানীতে ‘ম্যানিফেস্টো টক’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান : নয়া দিগন্ত

বাসস

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, তথ্য ও সম্প্রচার এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, পরিবেশ রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ইশতেহারে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও তা বাস্তবায়নে নানা পরিকল্পনা দিতে হবে।

গতকাল ঢাকায় আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদফতরে ইশতেহার নিয়ে চ্যানেল ওয়ান আয়োজিত চার পর্বের নির্বাচন ‘ম্যানিফেস্টো-টক’ অনুষ্ঠানের ৪র্থ ও শেষ পর্বে ‘রোড টু গ্রিন ম্যানিফেস্টো ডায়ালগ উইথ পলিটিক্যাল পার্টিস’ শীর্ষক ম্যানিফেস্টো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় উপদেষ্টা এ কথা বলেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, যে প্রজন্ম জুলাই আন্দোলন করতে পারে সেই প্রজন্ম বায়ুদূষণসহ নানা ধরনের দূষণরোধে কাজ করতে পারে। এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি সমাজ সচেতন বেশি। বর্তমান প্রজন্মের কাছে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য প্রত্যাশা করছি।

তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোকে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও বাস্তবায়নে নানা পরিকল্পনা দিতে হবে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে। পরিবেশ দূষণরোধে আপনাদের নির্বাচিত সরকারকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখতে হবে।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগতদের উদ্দেশ্যে উপদেষ্টা বলেন, যেকোনো প্রকল্প গঠন ও পরিকল্পনার আগে প্রকল্পের রোডম্যাপ থাকতে হবে। একটি দেশের দেড় বছরের মধ্যে সংস্কার করা সম্ভব নয়। এ সময়ে তবুও কিছু বড় কাজ হয়েছে। কিছু প্রকল্পের কাজ শুরু করা পরিকল্পনার কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে। দেশের জনগণের দেখতে হবে উন্নয়ন শুরু হয়েছে। বায়ুদূষণের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত বছরে ১০৬টি ইটভাটা চলেছে। আমাদের ১৩ শতাংশ বায়ুদূষণ হয় ইটভাটা, নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত রাখা, রাস্তার ধূলি ও বর্জ্য পোড়া। ৬ শতাংশ আছে পুরনো বাস থেকে। গাড়ির কালো ধোঁয়া বন্ধে একটা স্ক্রাব পলিসি করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ঢাকা শহরে চলাচলকারী যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। সরকার ২৮ হাজার ফিটনেসবিহীন বাস সড়ক থেকে সরাতে পারেনি। বিআরটিএকে তা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে। বিআরটিএকে বলা হয়েছিল সড়কে এসব ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলে আপনারা অনুমোদন দেন কী করে। বায়ুদূষণ কমাতে প্রায় ১০০টি ইলেকট্রিক বাস আনতে একটা প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন করা হয়েছে। বিআরটিএ সেই পলিসি হয়েছে করছে। শিগগিরই এ কাজ হবে।

জনস্বাস্থ্যে বায়ুদূষণ রোধে দেশে জেলা ও উপজেলার ইটভাটার মালিকদের নিয়ে মিটিং করা হয়েছে। সেখানে বলেছি ১০৬টি ইটভাটা ঢাকার এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের জীবনের থেকে বড় হতে পারে না। ফলে এবার আপনারা সাভারে ইটভাটা চালাবেন না। আমরা সাভারকে ডিগ্রেডেড এয়ার সেড হিসেবে ঘোষণা করেছি। বাংলাদেশের কোথাও এর আগে ডিগ্রেডেড এলাকা ঘোষণা করা হয়নি।

তিনি বলেন, উপস্থিত তরুণদের উদ্দেশ্যে আজকে আলোচনাটা করছি তোমরা দায়িত্বটা বুঝে নাও। উপদেষ্টা বলেন, অক্টোবর-নভেম্বরে ইটভাটা নিয়ে অভিযান শুরু করা হলো, নভেম্বর-ডিসেম্বরেও ইটভাটার মালিকদের মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ও অধিদফতর পর্যায়েও কথা হয়েছে। তার পরও উপজেলাপর্যায়েও ইটভাটা চালু রয়েছে। যখনই অভিযান চালানো হয়, তখনই হাইকোর্টের থেকে কাগজ নিয়ে আসে। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এটি একটি জাতীয় দর্শন হতে হবে। হাইকোর্ট আমাদের স্থগিতাদেশ দিল। আর ইটভাটার মালিকরা রাতের অন্ধকারে ইট পোড়াতে শুরু করল। পরিবেশ অধিদফতর রাতেও অভিযান পরিচালনা করেছে।

বায়ুদূষণ ২০২৪-এ যতটা শীর্ষে গেছে, ২০২৫ সালে সেই বায়ুদূষণ কিন্তু শীর্ষে যায়নি। অনেকটাই কমেছে। সুতরাং যেসব কাজ সফল হয়েছে তা নিয়ে আশা জাগাতে হবে, হতাশা জাগানো নয়।

উপদেষ্টা বলেন, আসলে এই অভিযান চালিয়ে কিছু হবে না। বায়ুদূষণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আইন মানতে হবে। আইন মানার কাজটি ইটভাটার মালিকদের করানো হয়েছে। এক বছরে এ পর্যন্ত বায়ুদূষণ উন্নয়নে অনেক কাজ হয়েছে। এক বছর থেকে দেড় বছরে যা কিছু সম্ভব হলো, তা নিয়ে কথা বলতে হবে। যে পর্যন্ত উন্নয়নের কাজ হয়েছে, এর থেকে কিভাবে সামনে এগোনো যায় তা নিয়ে কথা বলতে হবে। যে প্রজন্ম জুলাই আন্দোলন করতে পারে, সেই প্রজন্ম বায়ুদূষণসহ নানা ধরনের দূষণরোধ করতে পারে। আসলে বাজেট এলে সবচেয়ে কম বাজেট রাখা হয় পরিবেশ খাতে। পরিবেশ কখনোই বাজেটে প্রাধান্য পায় না।

তিনি বলেন, ইটভাটা নির্মাণ বন্ধ, নির্মাণসামগ্রী রেখে রাখা, উন্মুক্ত স্থানে সবুজায়ন করা হলে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে তিন বছরের মধ্যে। বায়ুদূষণ আর শীর্ষে যাবে না। পরিবেশ রক্ষায় আমরা যে সমাধানের প্রক্রিয়া চালু করেছি পরবর্তী সরকার এসব চলমান রাখবে বলে আশা করছি।

উপদেষ্টা বলেন, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণ ও পরিবেশদূষণ রোধে নির্বাচনের পর নতুন যে সরকার আসবে, তাদের এসব নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি চীনের বেইজিংয়ের সফলতার উদাহরণ টেনে বলেন, সরকারের পাশাপাশি জনসাধারণের সচেতনতার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

এ সময় ফারাক্কা বাঁধ ও তিস্তা বাঁধ নিয়ে উপদেষ্টা বলেন, তিস্তা বাজেট বাস্তবায়ন করতে চীনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে ওয়েস্ট ম্যানেজম্যান্ট নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সুষম ব্যবহার করতে হবে। তাতে বায়ুদূষণ কমবে। পরবর্তী সরকার এলে বর্জ্যকে রিসাইক্লিং করে তা সারে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য পরবর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

আগামী নতুন সরকারের জন্য প্রাধান্য দিয়ে তিনি কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। শব্দদূষণ নিয়ে তিনি বলেন, শব্দদূষণ নিয়ে যেসব কার্যক্রম হয়েছে তা যদি এগিয়ে নিয়ে যায় তাহলে বায়ুদূষণ কমবে। নয়েজ পলিউশন নিয়ে পুলিশ সার্জেন্টদের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। পুলিশ সার্জেন্টরা আগামীকাল থেকে এ কার্যক্রম আবার শুরু করবে। হর্ন নিয়েও নানা নির্দেশনা রয়েছে এ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হলে অযথা হর্ন দেয়ার প্রবণতা কমবে।

শব্দদূষণ রোধে শব্দদূষণ বিধিমালা ২০২৫ তৈরি করা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণেও বিধিমালা করা হয়েছে।

বনভূমি উদ্ধার নিয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শালবন, চুনতি অভয়ারণ্য ও সোনাদিয়াকে দখলমুক্ত করার কাজ চলমান। প্রায় ২০ হাজার একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে, যা ইকো পার্কের জন্য বরাদ্দ নেয়া হয়েছিল।

আটটি বিভাগীয় শহরে আটটি নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার কাজ চলছে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে ৬ থেকে ৭ কেজি পরিমাণ পলিথিনের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। এসব কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, এমন স্থান নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০টি খাল রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ প্রকল্প পাস হলে ৭৫০টি দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

পলিথিন নিয়ে তিনি বলেন, পলিথিন বন্ধে সরকার নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে।

অনুষ্ঠানে ব্রাইটারনের চেয়ার ফারিহা আমিরের সঞ্চালনায় বক্তৃতা করেন, ম্যানিফেস্টো টকের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান, সিপিআরডির প্রতিনিধি মো: শামসুদ্দোহা, সিইজিআইএসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান, ডিএনসিসির প্রশাসক মো: আজাদ, এনসিপ’র আরিফুল ইসলাম প্রমুখ।