মহানগরে নির্বাচনী গণসংযোগ
প্রশাসন বিশেষ দু’টি দলকে প্রাধান্য দিচ্ছে : মির্জা আব্বাস
ঢাকা-৯ আসনে ডা: তাসনিম জারার ইশতেহার ঘোষণা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বইছে উৎসবের আমেজ। রাজপথ থেকে অলিগলি- সর্বত্রই বিএনপি প্রার্থীদের সরব উপস্থিতিতে জমে উঠেছে প্রচারযুদ্ধ। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ভাসানটেকে বিআরবি মাঠে ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জনসভাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের মাঝে বাড়তি উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।
গত শুক্রবার রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। এরপর পর্যায়ক্রমে আরামবাগ বালুমাঠ, অগ্রণী ক্লাব আইডিয়াল এলাকায়, সন্ধ্যায় ব্যাংক কলোনি মসজিদ, রাত ৮টার ঢাবি জগন্নাথ হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের স্বরস্বতী পূজায় অংশগ্রহণ করেন। পরে রমনা কালিমন্দির সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে মতবিনিময় করেন। এসব এলাকায় তিনি মানুষের খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি নানা প্রতিশ্রুতি দেন।
শাহজাহানপুরে গণসংযোগকালে মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেন, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা বিশেষ দু’টি দলকে প্রাধান্য দিচ্ছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সব প্রার্থীকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রীতি ফুটবল ম্যাচ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, খেলাধুলা নিয়ে কোনো সরকারই কাজ করেনি। বর্তমানে খেলার অবস্থা তলানিতে। তারা ক্ষমতায় গেলে খেলাধুলা নিয়ে বেশি বেশি চর্চা করার ব্যবস্থা করা হবে।
প্রচারের দ্বিতীয় দিনে সহস্রাধিক ভোটার ও নেতাকর্মীর সমন্বয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে দিনভর নির্বাচনী প্রচারণা করেছেন ঢাকা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী তানভীর আহমেদ রবিন। সকালে কুদরত আলী বাজার থেকে গণসংযোগ শুরু হয়। এরপর দুপুরে বায়তুল আমান জামে মসজিদ জুমার নামাজ আদায় শেষে বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে দনিয়া বাজারে গিয়ে শেষ হয়।
তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, ‘এলাকার প্রতিটি মানুষ আমার আপনজন, আমার পরিবারের সদস্য। তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি দিন-রাত তাদের সেবার জন্য পরিশ্রম করব। আমাদের মধ্যে কোনো ফারাক থাকবে না।
তিনি বলেন, যারা ধর্মকে পুঁজি করে ভোট আদায়ের চেষ্টা করছে, তারা মূলত ধর্মের নামে মিথ্যাচার করছে এবং ধর্মপ্রাণ মানুষকে প্রতারিত করছে। ধর্মের অপব্যবহার, তথ্য জালিয়াতি ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ভোটারদেরকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ দিন সকালে মিরপুরের ১২ নম্বর পল্লবী স্টেশনের সামনে থেকে গণসংযোগ করেন ঢাকা-১৬ আসনের বিএনপির প্রার্থী আমিনুল হক। পল্লবী স্টেশন এলাকা থেকে শুরু হওয়া এ গণসংযোগ কর্মসূচিতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন এবং লিফলেট বিতরণ করেন তিনি। আমিনুল হক বলেন, জান্নাত দেয়ার মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। কোনো ব্যক্তি বা কোনো নির্বাচনী প্রতীক কাউকে জান্নাত দিতে পারে না।
এ দিকে রাজধানীর শাহীনবাগে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বিষয়ে দৃঢ়আশ্বাস প্রদান করে তিনি বলেন, আমাদের প্রতীক কোদাল। ধানের শীষ মানেই এখানে কোদাল মার্কা। বিএনপির চেয়ারম্যান আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। আপনারাও বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে পারেন। আমি আপনাদের সাথে নিয়ে একসাথে কাজ করতে চাই, মিলেমিশে এলাকার সব সমস্যা সমাধান করতে চাই।
রাজধানীর সবুজবাগে উঠান বৈঠক ও মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার রূহের মাগফিরাত কামনায় এক দোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে প্রচার চালিয়েছেন ঢাকা-৯ আসনের বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব। তিনি বলেন, শুধু নিজে ভোট দেয়া যথেষ্ট নয়, মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশীসহ সবাইকে কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের আগে দেশ, ক্ষমতার আগে জনতা, সবার আগে বাংলাদেশ। ভোট দিন ধানের শীষে, দেশ গড়ব মিলে মিশে।
এ ছাড়া বিএনপির প্রার্থী ঢাকা-১৮ আসনে এস এম জাহাঙ্গীর, ঢাকা-৭ আসনে হামিদুর রহমান, ঢাকা-৬ আসনে ইশরাক হোসেন দিনভর প্রচার চালিয়েছেন।
ঢাকা ৯ আসনে ডা: তাসনিম জারার ইশতেহার ঘোষণা
আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহার প্রকাশ করেছেন ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা: তাসনিম জারা। গতকাল বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার নিজের ভেরিফায়েড পেজে এই ইশতেহার প্রকাশ করেন।
এতে তিনি গ্যাস সঙ্কটের সমাধান, সড়ক সংস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসন; চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা; মাদক রোধ; স্কুলের ভর্তি বাণিজ্য বন্ধ; উদ্যোক্তাদের জন্য সিডিং ফান্ডের ব্যবস্থা এবং সংসদ সদস্যের জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাসনিম জারা লিখেছেন, ‘ঢাকা-৯ এই শহরের প্রাণ, অথচ আমাদের সাথেই বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়। আমরা গুলশান-বনানীর সমান ট্যাক্স দেই, সমান বিল দেই, কিন্তু সেবা পাই তৃতীয় শ্রেণীর। ভোটের সময় নেতারা আসেন, ভোট নেন, তারপর উধাও হয়ে যান। রাষ্ট্র আমাদের এটিএম মেশিন ভাবেন। টাকা নেয়ার সময় আছেন, সেবা দেয়ার সময় নেই।’
‘আমি পেশাদার রাজনীতিবিদ নই, আমি এই এলাকার মেয়ে। আমার কথা পরিষ্কার : ঢাকা ৯-কে অবহেলার দিন শেষ। আমরা সমান ট্যাক্স দেই, আমাদের অধিকারও সমান। আমাদের ন্যায্য পাওনা এবার আমরা বুঝে নিবো,’ উল্লেখ করেছেন তিনি।
গ্যাস সঙ্কট, বেহাল সড়ক ও জলাবদ্ধতা সমস্যার কথা উল্লেখ করে জারা বলেন, ‘প্রতি মাসে আমরা গ্যাসের জন্য বিল দিচ্ছি। কিন্তু চুলা জ্বালালে কী বের হয়? বাতাস। গ্যাস নেই, কিন্তু বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে। এটা এক ধরনের প্রতারণা। এর সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে আমাদের জিম্মি করে ফেলে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনা। তিনি বলেন, তিতাস যদি গ্যাস দিতে না পারে, তারা টাকা নিতে পারবে না। গ্যাস না থাকলে মাসিক বিল মওকুফ করার প্রস্তাব থাকবে এই বিলে।’
সিন্ডিকেট ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘পাইপলাইন গ্যাসের ব্যর্থতার দায় নিয়ে সরকারকে এই এলাকায় ভর্তুকি মূল্যে বা ন্যায্য দামে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য করব। সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রশাসনকে চাপ দেবো।’
‘ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বর্ষার আগেই খাল ও নর্দমা পরিষ্কার নিশ্চিত করতে আমি ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের ওপর কঠোর নজরদারি রাখব; ঘরের সামনে বা রাস্তায় ময়লার স্তূপ জমতে দেয়া হবে না। আধুনিক বর্জ্য অপসারণ (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন) ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ও এলাকার পার্কগুলোতে হাঁটার পরিবেশ উন্নত করতে সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয়ে কাজ করব।’
তিনি আরো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘রাস্তা খুঁড়ে ফেলে রাখা চলবে না। ওয়াসা বা সিটি করপোরেশন, যে-ই রাস্তা কাটবে, কাজ শেষ করার নির্দিষ্ট ‘ডেডলাইন’ থাকবে। ডেডলাইন মিস করলে ঠিকাদারকে জরিমানা গুনতে হবে।’
চিকিৎসায় অবহেলা আর মানব না উল্লেখ করে জারা বলেন, ‘ঢাকা-৯ এলাকায় আমরা ৭-৮ লাখ মানুষ বাস করি, অথচ আমাদের জন্য বড় হাসপাতাল মাত্র একটি, মুগদা মেডিক্যাল। এটা একটা নিষ্ঠুর কৌতুক। ৫০০ বেডের এই হাসপাতালে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ডাক্তার-নার্সরা অমানবিক চাপে কাজ করছেন, আর রোগীরা সেবা না পেয়ে ধুঁকছেন।
‘একজন ডাক্তারের হাতেই সমাধান হবে ঢাকা-৯ এর স্বাস্থ্য সমস্যা। আমি একজন ডাক্তার। আমার দেশ-বিদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি এই সমস্যা সমাধানে কাজ করব,’ যোগ করেন তিনি।
আমি ‘অতিথি পাখি’ নই, আপনাদের ঘরের মেয়ে উল্লেখ করে জারা বলেছেন, ভোটের আগে নেতারা পায়ে ধরেন, আর ভোটের পরে তাদের টিকিটিও দেখা যায় না। এমপি সাহেব থাকেন গুলশানে বা সংসদে, আর আপনারা থাকেন সমস্যায়। এমপিকে পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। এই সংস্কৃতি আর কতদিন?
আমি নির্বাচিত হওয়ার এক মাসের মধ্যে এলাকার প্রাণকেন্দ্রে আমার স্থায়ী অফিস চালু করব। কর্মজীবীদের সুবিধার্থে এটি সন্ধ্যায়ও খোলা থাকবে। আমি এবং আমার অফিসের স্টাফরা আপনাদের জানানো সব সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করব।
জারা বলেছেন, ‘আপনারা অনেক নেতা দেখেছেন, অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছেন। এবার একজন ডাক্তারকে সুযোগ দিন, যে ডাক্তার জানে রোগ কোথায় আর ওষুধ কোনটা, যে ডাক্তার কথা রাখে, যে ডাক্তার বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায়। এমন একজন শিক্ষিত সন্তানকে সুযোগ দিন, যে আপনাদের মাথানত হতে দেবে না।’
ফুটবল মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেছেন, আপনারা আমার শক্তি হোন, আমি আপনাদের কণ্ঠস্বর হবো। বিজয় আমাদের হবেই, ইনশাআল্লাহ।
ঢাকা-৯ আসন জেলার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ড তথা সবুজবাগ, খিলগাঁও, মুগদা ও মান্ডা থানা নিয়ে গঠিত।
ভোটের আমানত যোগ্য লোকের দায়িত্বে দিতে হবে : তাসলিমা আখতার
ঢাকা ১২ আসনে গণসংহতি আন্দোলন- জিএসএর মনোনীত প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেছেন, ভোট হচ্ছে জনগণের আমানত। এর ওপর ভিত্তি করেই সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন করবেন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের অভিযাত্রা শুরু করবেন, সব নাগরিকের মর্যাদার জীবন নিশ্চিত করতে নীতি প্রণয়ন করবেন। তাই এ মহামূল্যবান আমানত যারা রক্ষা করতে পারবেন, যারা আমানতের খিয়ানত করবেন না- এমন যোগ্য মানুষদের হাতেই ভোটের আমানত তুলে দিতে হবে। ঢাকা ১২ সংসদীয় আসনের ভোটররা সে কাজটি করবেন বলেই আমরা বিশ্বাস করি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার তৃতীয় দিনে গতকাল তাসলিমা আখতার তার নির্বাচনী এলাকা (ঢাকা ১২)-এর নাখালপাড়া এলাকায় গণসংযোগ করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন- ঢাকা ১২ নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডের নানা শ্রেণীপেশার নাগরিকদের পাশাপাশি গণসংহতি আন্দোলন-জিএসএর কেন্দ্রীয় ঢাকা মহানগরের নেতাকর্মীরা এবং তাসলিমা আখতারের গুণগ্রাহী শুভানুধ্যায়ীরা।
গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা-সংলগ্ন এলাকায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নির্বাচনী ইশতেহার উপস্থাপন করেছেন। ‘আমি নই আমরা : ঢাকা ১২-এর ১২ দফা ইশতেহার’ শিরোনামে ওই প্রস্তাবনায় তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নাগরিক সেবা সহজলভ্য করা, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-মাদক-দখলদারিত্ব প্রতিরোধ, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ প্রতিরোধ, নীতিনির্ধারণে ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ঢাকা ১২ সিটিজেন কাউন্সিল গঠনসহ বারো দফা প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বিজ্ঞপ্তি।