তেলের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা পাম্পের লাইনেই ইফতার
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ শুধু মানচিত্রের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক। যুদ্ধের আঁচ এসে লেগেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জ্বালানি তেলের ট্যাঙ্কেও। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন পাম্পে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন দীর্ঘ লাইন, যার ফলে তেলের পাম্পগুলোতেই ইফতার সারতে হচ্ছে শত শত মানুষকে।
বন্দরে জাহাজ, তবু কাটছে না হাহাকার
এরই মধ্যে আটটি তেলের জাহাজ চট্টগ্রামে বন্দরে পৌঁছেছে। সরকারিভাবে মজুদ পর্যাপ্ত দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। পাম্পে অপেক্ষারত এক ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, “শুনলাম বন্দরে জাহাজ এসেছে, তবুও আমাদের কেন কাল থেকে আজ পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে? চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছি আমরা, অথচ সমাধান মিলছে না।” জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের প্রবণতা এই সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করেছে।
শৃঙ্খলাহীনতা ও হাতাহাতি
রাজধানীর প্রধান প্রধান ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা গেছে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে মানুষের ধৈর্য চ্যুতি ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে সিরিয়াল ভেঙে আগে তেল নেওয়ার চেষ্টা করায় তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা।
একজন ক্ষুব্ধ গ্রাহক জানান, “আমরা নিয়ম মেনে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু অনেকে প্রভাব খাটিয়ে মাঝখান দিয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে নিজেদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হচ্ছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এই বিশৃঙ্খলার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।”
হুজুগে ভিড় ও জরুরি প্রয়োজনের সঙ্কট
সবচেয়ে করুণ অবস্থায় পড়েছেন জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ মানুষ। এক ভুক্তভোগী জানান, তার মা হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি। তাকে দেখতে যাওয়ার পথে মোটরসাইকেলের জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় তিনি পাম্পে আটকা পড়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, “যাদের একান্ত প্রয়োজন নেই, তারাও হুজুগে এসে ভিড় করছে। ফলে আমার মতো যাদের এখনই হসপিটাল যাওয়া জরুরি, তারা তেল না পেয়ে চরম দুর্দশায় পড়েছি।”
পাম্পের তপ্ত বাতাসে ইফতারের করুণ দৃশ্য
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেও তেলের লাইনের দৈর্ঘ্য কমে না। রোজা রেখে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে থাকা চালক ও সাধারণ মানুষ যখন ইফতারের আজান শোনেন তখন পাম্পের ধারেই বসে পড়তে হয় তাদের।
সেখানে ইফতারের আয়োজন খুবই সামান্য। কাগজের ঠোঙায় রাখা মুড়ি মাখানো, সামান্য ছোলা, পেঁয়াজু আর বেগুনিই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান মেনু। এক গ্লাস শরবত বা প্লাস্টিকের বোতলের সাধারণ পানি দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছেন ক্লান্ত চালক ও পাম্প কর্মীরা। ইঞ্জিনের গরম বাতাস আর ধুলাবালুর মাঝেই কোনোমতে ইফতার সেরে তারা আবার অপেক্ষায় ফেরেন তেলের জন্য। সঙ্কট কাটাতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে পাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে তেল বিক্রি বন্ধে কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হতে পারে।