শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে ডুয়েটের গৌরবময় অগ্রগতি

Printed Edition

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি

দেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার মানচিত্রে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে ২০২৫ সাল ডুয়েটের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়- যে বছরে পরিকল্পনা, নীতি ও বাস্তবায়নের সমন্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি কাঠামোগত সংস্কার থেকে শুরু করে গবেষণা ও উদ্ভাবনে এক দৃশ্যমান রূপান্তরের পথে অগ্রসর হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে দাঁড়িয়ে গত এক বছরের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ডুয়েট শুধু অর্জনের তালিকা বাড়ায়নি; বরং ভবিষ্যতের জন্য টেকসই ভিত্তি নির্মাণ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্সে রূপান্তরের লক্ষ্যে ভিশন ও মিশনের আলোকে একটি সুস্পষ্ট ও সময়োপযোগী রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ডুয়েটকে একটি আধুনিক গবেষণাভিত্তিক প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।

অবকাঠামো উন্নয়নে যুগান্তকারী অর্জন : ২০২৫ সালের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত অর্জন আসে ১৭ সেপ্টেম্বর, যখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুরের গবেষণাগারগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ আধুনিকায়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন (এম-ডুয়েট)’ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এই প্রকল্প ডুয়েটের গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

এম-ডুয়েট প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন, প্রায় ১১ হাজার ৫০৮ বর্গমিটার একাডেমিক ভবন এবং ৩৩ হাজার ৫০০ বর্গমিটার আধুনিক ল্যাবরেটরি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে প্রায় এক হাজার ৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন সুবিধা, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তঃক্যাম্পাস যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ডুয়েটকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিনির্ভর ক্যাম্পাসে রূপ দেবে।

নতুন ক্যাম্পাসে বিজয় ২৪ হলের উদ্বোধন শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কাজী নজরুল ইসলাম হলসংলগ্ন নতুন গেইট চালু হওয়ায় যাতায়াত আরো সহজ হয়েছে। ভবিষ্যতে ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে।

একাডেমিক উৎকর্ষ ও গবেষণার বিস্তার : বর্তমানে ডুয়েটে চারটি অনুষদের অধীনে ১৪টি বিভাগ, তিনটি ইনস্টিটিউট এবং একটি রিসার্চ সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের নতুন দু’টি বিভাগ চালুর প্রক্রিয়া চলমান, যা সময়োপযোগী ও ভবিষ্যতমুখী শিক্ষা বিস্তারে সহায়ক হবে।

২০২৫ সালে একাডেমিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ডুয়েটের বড় অর্জন হলো ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (আইএবি) কর্তৃক আর্কিটেকচার বিভাগের অ্যাক্রেডিটেশন লাভ। এ ছাড়া ইউজিসির ‘হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্পের আওতায় তিনটি উপ-প্রকল্প অনুমোদন এবং চলতি অর্থবছরে ৩৪টি গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন গবেষণাভিত্তিক সংস্কৃতিকে নতুন গতি দিয়েছে। একাডেমিক ক্যালেন্ডার যথাযথভাবে অনুসরণ, নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

প্রণোদনা বৃদ্ধিতে গবেষণায় নতুন মাত্রা : মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের থিসিস অনুদান বৃদ্ধি, টিচিং ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ এবং ফেলোশিপ ভাতা বাড়ানো গবেষণায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে। স্নাতক পর্যায়ের থিসিস অনুদান ও ডিনস অ্যাওয়ার্ডের প্রণোদনা বৃদ্ধি মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করেছে। ডুয়েট ডে-২০২৫ উপলক্ষে কৃতী শিক্ষার্থী ও কিউ-ওয়ান জার্নালে প্রকাশনার জন্য শিক্ষকদের একাডেমিক এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং ও কোলাবোরেশন : শিক্ষা ও গবেষণার মান, প্রকাশনা, সাইটেশন, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশনের ফলে কিউএস র‌্যাংকিংসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে ডুয়েটের অবস্থান উন্নত হয়েছে।

বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে এমওইউ স্বাক্ষর, যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ডুয়েটকে বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে আরো দৃঢ়ভাবে যুক্ত করছে।

প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন ও শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস : অনলাইন ভর্তি কার্যক্রম, কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার এবং ১৩ তলাবিশিষ্ট শহীদ আবু সাঈদ প্রশাসনিক ভবনের ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করেছে। মেধাভিত্তিক সিট বরাদ্দ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্লাব-সংগঠন ও ক্রীড়া কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে ভূমিকা রাখছে।

কর্মসংস্থান ও শিল্পসংযোগ : গত ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সপো অ্যান্ড জব ফেয়ার ২০২৫’-এ ৫০টির বেশি দেশী ও বিদেশী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং অ্যান্ড প্লেসমেন্ট সেন্টার এই কার্যক্রমকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।

চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি : রোবোটিক্স, আইওটি, এআই, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে কারিকুলাম ও গবেষণা জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি আইসিটি ইনকিউবেটর চালুর উদ্যোগ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উদ্ভাবনী ধারণাকে পণ্য ও সেবায় রূপ দেয়ার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে।

কর্তৃপক্ষের কথা : এদিকে ধারাবাহিক সাফল্যের বিষয়ে ডুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে অবকাঠামো, একাডেমিক উৎকর্ষ, গবেষণা সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসনের সমন্বয়ে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে ২০২৫ সালে ডুয়েট তার বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছে। সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ ও ভবিষ্যতমুখী নেতৃত্বে ডুয়েট এখন কেবল একটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং একটি উদ্ভাবনমুখী সেন্টার অব এক্সিলেন্সে রূপান্তরের পথে।