দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর তীব্র হামলা

Printed Edition
onno-1
দক্ষিণ লেবাননের মারুবে ইসরাইলি হামলায় নিহত চার হিজবুল্লাহ যোদ্ধা ও দুই বেসামরিক নাগরিকের দাফন করতে যাচ্ছেন তাদের স্বজনেরা : ইন্টারনেট

আনাদোলু ও আলজাজিরা

দক্ষিণ লেবাননের সীমান্তবর্তী তাল আল-নাহাস এলাকায় ইসরাইলি সেনা ও সামরিক যানবাহনের সমাবেশ লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। কফর কিলা গ্রামের উপকণ্ঠে অবস্থানরত ইসরাইলি বাহিনীকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলা সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

এর আগে, রোববার ইসরাইলি সামরিক বাহিনী স্বীকার করে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের একজন সেনা নিহত এবং আরো ছয়জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং দু’জন মাঝারি ধরনের আহত বলে জানানো হয়। তবে এই হতাহতের ঘটনা ঠিক কখন এবং কী পরিস্থিতিতে ঘটেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। হিজবুল্লাহ বলেছে, ইসরাইল বারবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করায় তার প্রতিবাদে তারা দক্ষিণ লেবাননে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর বিমান হামলা শুরু করে। এর দুই দিন পর, ২ মার্চ হিজবুল্লাহর আন্তঃসীমান্ত হামলার জবাবে ইসরাইল লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে।

অভ্যন্তরীণ সংলাপের আহ্বান হিজবুল্লাহর

আলজাজিরা জানিয়েছে, লেবানন সরকারকে ইসরাইলের সাথে সরাসরি আলোচনার পথে না গিয়ে অভ্যন্তরীণ সংলাপের ওপর গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন হিজবুল্লাহ প্রধান কাসেম। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে তিনি বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে হিজবুল্লাহকে শেষ করার ইসরাইলি লক্ষ্য সফল হয়নি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে লেবাননজুড়ে বিমান হামলার পরও হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়নি। কাসেম দাবি করেন, ‘শত্রু এখন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থতার মুখে। এই প্রতিরোধ অব্যাহত, শক্তিশালী এবং পরাজিত করা সম্ভব নয়।’ তিনি লেবানন সরকারের ইসরাইলের সাথে চলমান আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে জানান, সরাসরি আলোচনায় যাওয়ার আগে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হবে। তার দেওয়া শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে : স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে হামলা বন্ধ করা, দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইসরাইলের প্রত্যাহার, বন্দীদের মুক্তি, বাসিন্দাদের নিজ নিজ গ্রাম ও শহরে ফেরার সুযোগ এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করা।

কাসেম আরো বলেন, ‘লেবাননের কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো ইসরাইলের সাথে সরাসরি আলোচনা বন্ধ করা এবং বিকল্প হিসেবে পরোক্ষ আলোচনা গ্রহণ করা। পাশাপাশি মার্চ মাসে নেয়া সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে, যেখানে প্রতিরোধ আন্দোলন ও এর সাধারণ সমর্থকদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, লেবাননের অর্ধেকের বেশি জনগণ এই প্রতিরোধের অংশ এবং দেশের স্বার্থকে সবার আগে রেখে কোনো ধরনের বিদেশী চাপ বা ইসরাইলি নির্দেশনার কাছে নতি স্বীকার না করে অভ্যন্তরীণ সংলাপ চালিয়ে যাওয়া উচিত।

রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতেই লেবাননে হামলা নেতানিয়াহুর

হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কঠোর সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামাল দেয়ার কৌশল বলে দাবি করেছেন ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা। মিডল ইস্ট আই এ প্রকাশিত খবরে এ কথা জানা যায়। ইসরাইল হায়োম-এর খবরে বলা হয়েছে জনরোষ প্রশমিত করা এবং যুদ্ধের দায়ভার সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দিতেই প্রধানমন্ত্রী এই লোকদেখানো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে নেতানিয়াহুর ওই নাটকীয় বিবৃতির পর রণক্ষেত্রে সামরিক নির্দেশনায় কার্যত কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। খবরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে তাদের পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে পাওয়া আগের নির্দেশনার বাইরে নতুন কোনো অপারেশনাল প্ল্যান বা কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়নি। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধবিরতির রূপরেখার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই বর্তমানে সব ধরনের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে এটিই স্পষ্ট হচ্ছে, জনসমক্ষে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার কঠোর বার্তা দিলেও পর্দার আড়ালে নেতানিয়াহু প্রশাসন পূর্বের সমঝোতাগুলো মেনেই এগোচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজা ও লেবানন যুদ্ধে আশানুরূপ সাফল্য না আসা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঙ্ঘাতের ফলে ইসরাইলের অভ্যন্তরে যে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা থেকে বাঁচতেই নেতানিয়াহু এ ধরনের কড়া বক্তব্য দিচ্ছেন। ২৫ এপ্রিল ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজের সামনে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মুখোশ পরে বিক্ষোভকারীদের প্রতিবাদ কর্মসূচিও ইঙ্গিত দেয় যে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ক্ষেত্রেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ বাড়ছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই চাপে নিজেকে শক্তিশালী নেতা হিসেবে জাহির করতে এবং যেকোনো সামরিক ব্যর্থতার দায় থেকে মুক্তি পেতে তিনি সেনাবাহিনীকে সামনে ঠেলে দিচ্ছেন।

সামগ্রিকভাবে ‘ইসরাইল হায়োম’-এর এই খবরটি নেতানিয়াহু সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও আস্থার সঙ্কটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানোর কথা বলছেন, সেখানে সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী কার্যক্রমগুলো কেবল পূর্বের রুটিন মাফিক পরিচালিত হচ্ছে। এই দ্বিমুখী অবস্থানের ফলে হিজবুল্লাহর সাথে চলমান সঙ্ঘাতের প্রকৃত ভবিষ্যৎ এবং ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যুদ্ধের ময়দানে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না আসায় প্রধানমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক কৌশল শেষ পর্যন্ত তার জনপ্রিয়তা কতটা রক্ষা করতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।