জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে প্রভাব কিছুটা বাড়ত!

সীমাবদ্ধ ক্ষমতার বৃত্তে রাষ্ট্রপতি

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition
back-1
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বঙ্গভবনে তার কার্যালয়ে দাফতরিক কাজ শুরু করেন : পিআইডি

দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় পর সরকার ও বিরোধী জোটের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও সাংবিধানিক সংস্কারের জোরালো আলোচনাও হয়েছে। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোতে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা মূলত আনুষ্ঠানিক ও সীমিতই রয়ে গেছে। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সাথে ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি আলোচনাও হয়েছিল। যদিও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের কোনো কাঠামোগত বা সাংবিধানিক পরিবর্তন এখনো আসেনি।

সূত্র মতে, প্রচলিত সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির বেশির ভাগ কাজই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হয়, ফলে পদের অলঙ্কারিক স্বরূপ তাৎক্ষণিকভাবে বদলায়নি। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র আধিপত্য কমানো এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনভাবে নিয়োগের নানা প্রস্তাব জুলাই সনদে থাকলেও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন ও কাঠামোগত রূপান্তর এখনো প্রশ্নবিদের মুখে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রতীকী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ দেখা গেলেও ক্ষমতার প্রকৃত ভারসাম্য নিশ্চিত করার জন্য যে গভীর আইনি সংস্কার প্রয়োজন তা নিয়ে বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক মহলে ভিন্ন মত রয়েছে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী। জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বাড়ত।

সূত্র মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো এবং কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোসহ বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব ছিল জুলাই সনদে। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসেও সেই সনদ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও বাড়েনি। অবশ্য ক্ষমতাসীন বিএনপি বলেছে, যেভাবে জুলাই জাতীয় সনদ সই হয়েছে, তারা সেভাবে বাস্তবায়ন করবে। সে অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। শেষ পর্যন্ত এটি হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এই চার প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনভাবে নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা পাবেন রাষ্ট্রপতি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার’। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনার লক্ষ্যে প্রস্তাব তৈরি করতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। পরে কমিশনগুলোর প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য সৃষ্টি করতে গঠন করা হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনা শেষে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। যেখানে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব স্থান পায়। এর মধ্যে সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব আছে ৪৮টি। সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব স্থান পেয়েছে। অবশ্য কিছু প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্ন মত আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। এই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং কার্যকরী ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যমান সংবিধান পর্যালোচনা করে সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। সাংবিধানিক সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ, পর্যাপ্ত ক্ষমতায়ন। এই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং কার্যকরী ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি।

জানা গেছে, জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা বলেছিল কমিশন। এ জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ পদ্ধতি বদলানো, কিছু নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন ক্ষমতা দেয়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একই ব্যক্তি যাতে দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে না পারেন সে ব্যবস্থা করা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার মতো প্রস্তাব ছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এসব ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার (এনএসআই) মহাপরিচালকসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেয়ার প্রস্তাব ছিল। সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার হলেও তিনি ইচ্ছেমতো কাউকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন না। সংবিধানে বলা আছে, যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবে, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত।

বিএনপি বলে আসছে, তারা ভিন্ন মতসহ যেভাবে জুলাই সনদ সই করেছে, সেভাবে বাস্তবায়ন করবে। সংবিধান সংশোধন করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদিও বিরোধী দল এ কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্য দিকে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। তবে কিভাবে এটি করা হবে, তার বিস্তারিত সেখানে উল্লেখ করা হয়নি। এ ছাড়া দলটি তাদের ইশতেহারে উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির কথাও বলেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়েও জুলাই সনদে প্রস্তাব আছে। এখন ভোট হয় প্রকাশ্যে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না। জুলাই সনদে সংসদের নি¤œকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার প্রস্তাব আছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে। জুলাই জাতীয় সনদে আমরা যেভাবে একমত হয়েছি, সেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধিত হয়ে যাবে, তার পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে, তখন সেই ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারেই হবে। ৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরো বেশি সম্মানিত হতো।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপি সরকার গণভোটের রায়ের সাথে প্রতারণা করেছে উল্লেখ করে বলেন, সরকার আমাদের যাবতীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সাথে প্রতারণা করেছে। তারা সারা দেশে দলীয়করণ করছে। প্রশাসনের সব জায়গায় এবং এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও এক প্রকার দলীয়করণের মাধ্যমেই দলীয় প্রার্থী দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করছেন। যেখানে স্বাধীনভাবে কোনো ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল না। তিনি আরো বলেন, বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার যে ভারসাম্য থাকার কথা, দেশ সে ধরনের ভারসাম্যের দিকে এগোতে পারছে না। তবে গণতন্ত্রের প্রতি নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতেই বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তার ভাষায়, জনগণের কাছে একটি বার্তা দেয়া এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার লক্ষ্যেই নিশ্চিত পরাজয় জেনেও বিরোধী দল প্রার্থী দিয়েছিল।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজির আহমদের মতে, অনেকে বলে থাকেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা মধ্যে ভারসাম্য আনতে। এ নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত হওয়া জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলোচনাও হয়েছে। এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রতত্ত্বের ধারণার সাথে সঙ্কতিপূর্ণ নয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা মধ্যে ভারসাম্য আনতে গেলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে উঠবে, যা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে। রাষ্ট্রপতির পদ ও প্রতিষ্ঠানকে যত বেশি স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বজনগ্রাহ্য করা হবে এবং বিতর্ক ও সমালোচনার বাইরে রাখা যাবে, ততই শক্তিশালী হবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা নয় বরং নির্দিষ্ট, সুস্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীন কর্তৃত্ব দেয়া, যাতে তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করতে পারেন, দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার একজন পক্ষ হিসেবে নয়। প্রতিরক্ষা ও উচ্চশিক্ষা এমন দু’টি ক্ষেত্র, যেখানে দলীয় হস্তক্ষেপের ক্ষতি এরই মধ্যেই সুস্পষ্ট এবং যেখানে একজন নিরপেক্ষ সাংবিধানিক অভিভাবকের উপস্থিতি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রশ্নে সঙ্কীর্ণ দলীয় হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে ওঠে সমাধান করতে হবে।