অনিশ্চয়তায় ১৩০০ কোটি টাকার জিকে সেচ প্রকল্প

অনুমোদনের ৮ মাসেও দরপত্র হয়নি

Printed Edition

আ ফ ম নুরুল কাদের কুষ্টিয়া

দেশের অন্যতম বৃহৎ গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করতে ‘জি কে সেচ প্রকল্পের জরুরি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ’ শীর্ষক এক হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পাওয়ার পর আট মাস পার হয়ে গেছে। তবে এখনো আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় সরকারের এই কল্যাণমুখী উদ্যোগ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন এবং ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে তীব্র সংশয় ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকল্পের তিনটি প্রধান পাম্পের মধ্যে দু’টি অকার্যকর। বর্তমানে মাত্র একটি পাম্প দিয়ে ধিমেতালে চলছে পানি সরবরাহ। ফলে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা- এই চার জেলার ১৩টি উপজেলার হাজার হাজার কৃষক সময়মতো সেচের পানি না পেয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পাম্প দু’টি পুনর্বাসনের অনুমোদিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৪১৬ কোটি টাকা ধরা হলেও অবকাঠামোগত কাজ শুরু করা যায়নি।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালে জরিপের পর ১৯৫৪ সালে তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় এবং ১৯৬২-৬৩ মৌসুমে স্থানীয় ধান চাষের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম চালু হয়। ১৯৯৩ সালে ব্যাপক সংস্কারের পর এ অঞ্চলের কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। তবে পদ্মা নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় সেচ কার্যক্রমে সঙ্কট তৈরি হয়। ভেড়ামারায় পদ্মার তীর থেকে পানি তুলে চার জেলার ৯৫ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্য থাকলেও পলি জমে তা কমে এসেছে। বর্তমানে সরকারি নথি অনুযায়ী মাত্র ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে পানি পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও জিকে সেচ প্রকল্পের পিডি জাহিদুর রহমান জানান, ২০২১ সালে একটি এবং সম্প্রতি আরো একটি পাম্প বিকল হয়ে পড়েছে। গত বছর ২৩ ডিসেম্বর একনেকে প্রকল্পটির অনুমোদন মেলে। বর্তমানে পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে, যা চূড়ান্ত হতে আরো ২-৩ মাস লাগবে। এরপর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দিতে আরো ৫-৬ মাস সময় প্রয়োজন। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত বাজেট পাওয়া সাপেক্ষে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে নতুন পাম্প চালু করা সম্ভব হবে।

প্রকল্প প্রস্তাবে মূল দু’টি পাম্প পুনর্বাসনে ৪১৬ কোটি টাকা, নতুন সাবসিডিয়ারি পাম্পহাউজ নির্মাণে ১০৯ কোটি টাকা, মোটরসেট স্থাপনে ২৫৫ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং সেচ খাল ও পুর্ত কাজে শতকোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে অঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র বদলে যাবে বলে প্রকৌশলীরা আশা ব্যক্ত করছেন। এ দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ভেড়ামারা পাম্প হাউজের অকার্যকর দু’টি পাম্পের কারণে প্রতিদিন মাত্র এক হাজার ৩০০ কিউসেক পানি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক শুকুর আলী ও আতিয়ার রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে একটি পাম্পের ওপর ভরসা করে চললে বোরো ও আমন মৌসুমে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত বাজেট ছাড় ও পাম্প পুনর্বাসনের জন্য সংসদে বিষয়টিকে জোর দেয়ার আশ্বাস দেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের জেলা উপপরিচালক ড. শওকত হোসেন ভূঁইয়া জানান, ৫২ হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি এই সেচের ওপর নির্ভরশীল। তাই দ্রুততম সময়ে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।