লড়াইয়ের দেড় বছর পর জুলাই আহত যোদ্ধাদের অবস্থা
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জুলাই আন্দোলনের আহতদের জন্য দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন হয়নি- এমন অভিযোগই তুলছেন ভুক্তভোগীরা। অন্য দিকে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি সরকার জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের কল্যাণে বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হাতে নেয়ার কথা জানিয়েছে।
গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ২০২৬’। এই আইনটির লক্ষ্য ছিল আন্দোলনে অবদান রাখা ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র নিয়ে শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের বক্তব্য ভিন্ন।
সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে বা এর অধীনে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা জুলাই আন্দোলনের ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা তদারকি করবে। গুরুতর আহতদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘রেড কার্ড’ বা বিশেষ ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড- যার মাধ্যমে তারা সরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়ার কথা। এ ছাড়া শহীদদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ব্যয় বহনের ঘোষণাও রয়েছে।
তবে সরেজমিনে এসব ঘোষণার সাথে বাস্তবতার অমিল চোখে পড়ে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শহীদের পিতা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “আজ আমরা অত্যন্ত অসহায়। সরকারি কোনো কাজে গেলে শুনতে হয়- ‘এরা তো টাকা পেয়েছে, আবার কেন এসেছে?’ এমন আচরণে মনে হয়, আমাদের সন্তানদের আন্দোলনে অংশ নিতে দেয়া কি ভুল ছিল? শহীদ পরিবারের মর্যাদা কি আমরা আদৌ পাচ্ছি?”
একই ধরনের হতাশার কথা জানান ২০ বছর বয়সী আহত যোদ্ধা ফজলুল করিম। তিনি বলেন, “১৮ জুলাই ২০২৪ যাত্রাবাড়ীতে ছররা গুলিতে আমি গুরুতর আহত হই। দেড় বছর পার হলেও পরিবারের জন্য কোনো কর্মসংস্থান বা আবাসনের ব্যবস্থা হয়নি। পুনর্বাসনের যে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল, তার বাস্তব রূপ পায়নি। সরকারি সহায়তা পেতেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে এক লাখ টাকা পেলেও তা তুলতে গিয়ে ৮-৯ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। ছোটখাটো অনুদানও অনেক সময় পাইনি। বর্তমানে ঋণের চাপে পড়ে নিজের রিকশা বিক্রি করে দিতে হয়েছে।”
১৯ বছর বয়সী আহত ইয়াহইয়া আল হুনাইদি জানান, পুলিশের আঘাতে তার হাত ভেঙে যায়। “সরকারি অনুদান হিসেবে তিন লাখ টাকা ও ভাতা পাচ্ছি, কিন্তু স্থায়ী পুনর্বাসন বা কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। হাতে আবার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, কিন্তু উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছি না। স্বাস্থ্য কার্ড থাকলেও হাসপাতালে সেবা পেতে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়,”-বলেন তিনি।
আরেক যোদ্ধা মুজাহিদের অভিযোগ, “দেশ যেন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। বাকস্বাধীনতা সঙ্কুচিত হচ্ছে। আমার সহযোদ্ধাদের কেউ কেউ ডিবি পরিচয়ে তুলে নেয়ার শিকার হচ্ছে।”
আইনি কাঠামো ও বড় বাজেটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে হতাশাজনক। সাভারের আশুলিয়ায় গুলিতে দৃষ্টিশক্তি হারানো রিকশাচালক মিজান কিংবা যাত্রাবাড়ীতে আহত ফজলুল করিমের মতো বহু যোদ্ধা এখনো আর্থিক অনটনে দিন কাটাচ্ছেন।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সমন্বয়হীনতা এবং তদারকির ঘাটতির কারণে অনেক পরিবার এখনো প্রতিশ্রুত সহায়তা পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শহীদ পরিবারগুলোর দাবি- তারা শুধু এককালীন অনুদান নয়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা চান।
জুলাই আন্দোলনের এই যোদ্ধাদের জন্য ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।