কিশোরগঞ্জের ঠোঁট রাঙানো ‘লালডিঙি’ পান

Printed Edition
bangla-5
কিশোরগঞ্জের ঠোঁট রাঙানো ‘লালডিঙি’ পান

আল আমিন কিশোরগঞ্জ

পান বাঙালির চিরন্তন আতিথেয়তা ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আদিকাল থেকে পান চিবানোর এই অভ্যাস কারো কাছে শখ, আবার কারো কাছে আসক্তি। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে বিভিন্ন সামাজিক রীতি ও উৎসবে পানের সমাদর আকাশচুম্বী। একসময় কনের বাড়িতে বরপক্ষ পান না নিয়ে গেলে বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যাওয়ার নজির রয়েছে এ দেশে। যুগের বিবর্তনে প্রাচীন সেই পানদানি বা সরতা আজ সোনালি অতীতে ঠাঁই নিলেও পানের কদর কমেনি এতটুকু। সেই ঐতিহ্যের ধারায় এখন সবার নজর কাড়ছে কিশোরগঞ্জের অনন্য জাতের ‘লালডিঙি’ পান।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে ‘লালডিঙি’ পানের সুখ্যাতি বেশ পুরনো। আকারে বিশাল, পুরু গঠন, মসৃণ এবং সুগন্ধি হওয়ায় এই পানের জনপ্রিয়তা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়েছে। কিশোরগঞ্জের মানুষ পান বলতে একনামে এই লালডিঙিকেই বোঝেন। প্রাকৃতিক সুগন্ধ ও রসে ভরপুর হওয়ায় ভোজন রসিকদের কাছে এর কদর আলাদা। স্থানীয়দের মতে, আকারে বড় হওয়ায় এই পান খিলি পানের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। আর এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে আমেরিকা ও মালয়েশিয়ায় পৌঁছে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের এই বিশেষ পান।

কিশোরগঞ্জ শহরের পুরান থানা বাজারে ঢুকলেই দেখা যায় দুই পাশের গলিজুড়ে পানের পসরা। এই বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল মালেক জানান, বংশপরম্পরায় তারা পানের ব্যবসা করছেন। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় এই পানের চাষ সবচেয়ে বেশি হয়। এ ছাড়া করিমগঞ্জ, হোসেনপুর, কটিয়াদী ও পাশের জেলা ময়মনসিংহের নান্দাইলেও লালডিঙি পানের ফলন ভালো হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি দিন এই বাজারে কয়েক লাখ টাকার পান বেচাকেনা হয়। প্রতি বিড়া (১২০টি পান) লালডিঙি পান মানভেদে ২০০ থেকে ২৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পাকুন্দিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে এই পান চাষ করছেন। বিশেষ করে বরাটিয়া, সৈয়দগাঁও, হিজলিয়া ও দরদরা গ্রামে ব্যাপক আকারে পানের বরজ গড়ে উঠেছে। কৃষকেরা জানান, তারা মূলত ‘লালডিঙি’ ও ‘ঘয়াসুর’ এই দুই জাতের দেশী পান চাষ করেন। তবে স্বাদে ও গন্ধে সেরা হওয়ায় লালডিঙির আবাদই বেশি। ভাদ্র থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত পানের প্রধান মৌসুম থাকলেও সারা বছরই কমবেশি ফলন পাওয়া যায়। হিজলিয়া গ্রামের কৃষক আবদুল আউয়াল জানান, তিন কাঠা জমিতে পান চাষ করতে তার প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে, যা থেকে এখন প্রতি সপ্তাহে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার পান বিক্রি করছেন তিনি।

তবে পানের সমাদর থাকলেও চিকিৎসকেরা পরিমিত খাওয়ার পরামর্শ দেন। কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন ডা: ফারুক আহমেদ সতর্ক করে বলেন, রঙিন মসলা, অতিরিক্ত সুপারি ও জর্দা দিয়ে পান খাওয়া মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, লালডিঙি পান শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং এটি কিশোরগঞ্জের জেলা ব্র্যান্ডিংয়েও ভূমিকা রাখছে। এই পানের সুগন্ধি ইতিহাস এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের বাজারেও পৌঁছে যাচ্ছে।