ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করার দাবি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের
Printed Edition
আলজাজিরা
ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ‘অবৈধ’ যুদ্ধ উসকে দেয়ার অভিযোগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসন বা ক্ষমতাচ্যুত করার দাবি জোরালো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করে ট্রাম্পকে অবিলম্বে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য মন্ত্রিসভার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
কংগ্রেস সদস্যদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এবং ভাষা ‘উন্মাদনা’র পর্যায়ে চলে গেছে। বিশেষ করে গত ৪৮ ঘণ্টায় ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করার যে আল্টিমেটাম তিনি দিয়েছেন, তাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে গণ্য করছেন অনেক আইনপ্রণেতা।
অ্যারিজোনার আইনপ্রণেতা ইয়াসমিন আনসারি এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘ট্রাম্প একটি বিধ্বংসী ও অবৈধ যুদ্ধ ত্বরান্বিত করছেন। তার বক্তব্য সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে।’ মিনেসোটার প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা ইলহান ওমর ট্রাম্পকে ‘উন্মাদ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এটি মেনে নেয়া যায় না। ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করুন, অভিশংসন করুন। এই উন্মাদকে এখনই অফিস থেকে সরাতে হবে।’
নিউ মেক্সিকোর কংগ্রেস সদস্য মেলানি স্ট্যানসবারি সরাসরি মন্ত্রিসভাকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এখনই ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের সময়।’ ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বলেছেন, ‘আমি যদি ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে ইস্টার ছুটির পুরোটা সময় সাংবিধানিক আইনজীবীদের সাথে কথা বলতাম। তিনি এরই মধ্যে হাজারও মানুষকে মেরেছেন, আরো হাজার হাজার মানুষকে মারতে যাচ্ছেন।’ এমনকি সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য জো ওয়ালশ ট্রাম্পকে ‘দেশ ও বিশ্বের জন্য কলঙ্ক’ হিসেবে অভিহিত করে তাকে সরানোর দাবি জানিয়েছেন।
মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী, যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য মনে করেন, প্রেসিডেন্ট তার দায়িত্ব পালনে অক্ষম বা অযোগ্য, তবে তারা তাকে সরিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এক দিকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং অন্য দিকে দেশের ভেতরে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই সাংবিধানিক বিদ্রোহ- সবমিলিয়ে ওয়াশিংটন এখন এক নজিরবিহীন সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধের তথ্য ফাঁস করায় এবার সংবাদমাধ্যমের ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ
এনডিটিভি জানায়, ইরানে বিধ্বস্ত মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় ক্রু সদস্যের নিখোঁজ থাকার তথ্য সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (৬ এপ্রিল) হোয়াইট হাউজের এক ব্রিফিংয়ে তিনি অভিযোগ করেন, এই তথ্য ফাঁসের কারণে মার্কিন বাহিনীর উদ্ধার অভিযান চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, তথ্যটি ফাঁস হওয়ার আগ পর্যন্ত ইরান জানতই না যে আরো একজন মার্কিন সেনা তাদের ভূখণ্ডে নিখোঁজ রয়েছেন। কিন্তু গণমাধ্যমে এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তেহরান সতর্ক হয়ে যায় এবং ওই সেনাকে খুঁজে বের করতে পুরস্কার ঘোষণা করে। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই তথ্য ফাঁসকারী বা ‘মোল’ কে খুঁজে বের করতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমগুলোকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা এই সংবাদ প্রকাশ করেছে তাদের কাছে গিয়ে সূত্রের পরিচয় জানতে চাওয়া হবে। তিনি সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে হয় সূত্রের নাম দিন, নাহলে জেলে যান। ট্রাম্পের মতে, ওই তথ্য প্রকাশের ফলে নিখোঁজ সেনার অবস্থান খুঁজে বের করা মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য কয়েক গুণ বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তিনি তথ্য ফাঁসকারী ব্যক্তিকে একজন ‘অসুস্থ ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, হয়তো ওই ব্যক্তি বুঝতে পারেনি এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তবে যেই এই কাজ করুক না কেন, তাকে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে বদ্ধপরিকর বর্তমান প্রশাসন। এই উদ্ধার অভিযানের নাটকীয়তা সম্পর্কে জানা গেছে, গত শুক্রবার দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর পাইলট ও ওয়েপন সিস্টেম অফিসার-উভয়েই প্যারাসুট দিয়ে নেমে যেতে সক্ষম হন। পাইলটকে দ্রুত উদ্ধার করা গেলেও দ্বিতীয় ক্রু সদস্য দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিলেন।
নেভি সিল টিম সিক্সের কমান্ডোরা ইরানের ভূখণ্ডের গভীরে ঢুকে এই শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযান চলাকালে ইরানি কনভয়কে দূরে সরিয়ে রাখতে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হয়। এমনকি ওই সেনাকে উদ্ধারের আগ পর্যন্ত সিআইএ একটি সুকৌশলী বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালিয়েছিল যাতে ইরান মনে করে যে উদ্ধার কাজ আগেই শেষ হয়ে গেছে।
বর্তমানে উদ্ধারকৃত দুই সেনাসদস্যই বিপদমুক্ত এবং সুস্থ আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সোমবার হোয়াইট হাউজের ইস্টার এগ রোল অনুষ্ঠান চলাকালে সাংবাদিকদের তিনি জানান, ‘পাইলট এবং ক্রু সদস্য উভয়ই বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং তারা বেশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।’ যদিও তারা দু’জনই কিছুটা আহত হয়েছিলেন, তবে বর্তমানে তাদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের ভেতরে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কোনো যুদ্ধবিমান হারানোর ঘটনা। এ সফল উদ্ধার অভিযানটি এক দিকে মার্কিন কমান্ডোদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে, অন্য দিকে অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁসের ঘটনায় হোয়াইট হাউজ ও সংবাদমাধ্যমের মধ্যে নতুন করে এক চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।