মধুসূদন দত্ত ও আধুনিকতা
Printed Edition
আল পারভেজ
১৮২৪ সালের এক শীতের সকালে সাগরদাঁড়ির কপোতাক্ষ তীরের নিভৃত পল্লীতে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল, সেদিনের সেই গ্রাম্য নিস্তব্ধতা কি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়েছিল যে এ ব্যবস্থার বুক চিরে এক দিন এক মহাবৈপ্লবিক ঝঞ্ঝা ধেয়ে আসবে? মধুসূদন দত্ত যখন বড়ো হচ্ছিলেন, তখন তার রক্তে বইছিল এক অস্থির উচ্চাকাক্সক্ষা। তিনি চেয়েছিলেন বিলেত যেতে, চেয়েছিলেন লর্ড বায়রন কিংবা মিল্টনের মতো ইংরেজি সাহিত্যের আকাশে ধ্রুবতারা হতে। কিন্তু নিয়তি তাকে নিয়ে এলো অন্য এক মোহনায়। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ, বিলেতবাস ও শেষমেশ গভীর এক দহন শেষে তিনি উপলব্ধি করলেন, পরভৃত হয়ে পরের ভাষায় গান গেয়ে অমরত্ব মেলে না। এই যে নিজের শিকড়কে চেনা, আবার সেই শিকড়কে আধুনিকতার কুঠার দিয়ে নতুন রূপ দেয়া, এটাই মধুসূদনের ‘আধুনিকতা’। আজ ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি, তার ২০২তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পেছনে তাকাই, দেখি তিনি কেবল একজন কবি নন, তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক ‘স্থপতি’।
মধুসূদনের আধুনিকতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল তার ছন্দের মুক্তি। বাংলা কবিতার হাজার বছরের ইতিহাস ছিল ‘পয়ার’ ছন্দের শৃঙ্খলে বন্দী। দুই চরণের শেষে মিল দেয়ার যে বাধ্যবাধকতা, তা যেন কবির ভাবপ্রকাশের পথে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল ছিল। মধুসূদন সেই দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন। তিনি নিয়ে এলেন ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ’ (Blank Verse)। তিনি বুঝলেন, বীররস বা মহাকাব্যের গাম্ভীর্য রক্ষা করতে হলে ছন্দের অন্ত্যমিলের শিকল ভাঙা জরুরি।
মেঘনাদবধ কাব্য-এ আমরা দেখি তার সেই অসামান্য কারুকাজ :
‘সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবী অমৃতভাষিণি,
কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে,
পাঠাইলা রণে পুন রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি?’
এখানে লক্ষ্য করুন, বাক্যের যতি বা থামা কেবল চরণের শেষে নয়, বরং ভাবের প্রয়োজনে চরণের যেখানে-সেখানে বসছে। এই যে প্রবাহমানতা, এটাই আধুনিকতা। প্রখ্যাত সমালোচক বুদ্ধদেব বসু তার ‘অনাদি ও অনন্ত’ প্রবন্ধে মধুসূদন সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছিলেন, মধুসূদনই প্রথম আমাদের কবিতায় ‘ব্যক্তিত্ব’ (Individualism) এনেছিলেন। তিনি প্রথাগত রাম-রাবণ যুদ্ধের বয়ান পাল্টে দিয়ে রাবণকে করলেন এক ট্র্যাজিক হিরো, যার ভেতরে রক্ত-মাংসের মানুষের হাহাকার আর আভিজাত্য বিদ্যমান।
মধুসূদনের আরেক কালজয়ী সৃষ্টি হলো বাংলা ‘সনেট’ বা চতুর্দশপদী কবিতাবলি। ইতালীয় কবি পেত্রার্কের প্রবর্তিত এই কঠিন শিল্পকাঠামোকে তিনি বাংলা ভাষায় সার্থকভাবে প্রয়োগ করলেন। তার সনেটগুলো কেবল আঙ্গিকগতভাবে নতুন ছিল না, বরং তাতে ছিল ব্যক্তিগত আবেগ আর বিশ্বজনীনতার এক অদ্ভুত মিশেল। তার বিখ্যাত ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটটির কথা ধরা যাক :
‘সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে!
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;’
এখানে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে বসে কবি তার ফেলে আসা শৈশবের নদকে স্মরণ করছেন। কিন্তু এই নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা কেবল রোদন নয়, এটি এক আধুনিক মানুষের আত্মানুসন্ধান। প্রমথ চৌধুরী মধুসূদনের এই সনেট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, মধুসূদনই বাংলা ভাষায় প্রথম দেখিয়েছেন যে ভাবকে কীভাবে সংহত ও সুসংবদ্ধ করতে হয়।
২০২৬ সালের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে দাঁড়িয়ে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? বর্তমানে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে অনায়াসেই ছড়া বা কবিতা লেখা সম্ভব হচ্ছে, তখন মধুসূদনের ‘মৌলিকতা’ আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। মধুসূদন কেবল বিদেশী আঙ্গিক ধার করেননি, তাকে দেশজ ঐতিহ্যের সাথে ‘সিন্থেসিস’ বা সংশ্লেষণ করেছেন। আজকের লেখক ও পাঠকদের কাছে মধুসূদন এক অনুপ্রেরণার নাম, কারণ তিনি শিখিয়েছেন কিভাবে বৈশ্বিক হয়েও দেশী থাকা যায় (To be local, one must be global, and vice versa)।
আজকের তরুণ কবিরা যখন মুক্তগদ্য বা গদ্যছন্দে কবিতা লিখছেন, তার আদি উৎস কিন্তু সেই অমিত্রাক্ষর ছন্দেই নিহিত। ভাষার প্রথাগত জট খুলে দিয়ে শব্দকে স্বাধীন করার সাহস তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন। তার সেই বিখ্যাত উক্তি- I shall throw a damper on the flowery language of our Pundits- আজো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক বাংলা গদ্যের যে ঋজুতা এবং পদ্যের যে নাটকীয়তা, তার ভিত্তিপ্রস্তর মধুসূদনই স্থাপন করেছিলেন।
উপসংহারে বলা যায়, মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের সেই নক্ষত্র, যিনি রাহুগ্রস্ত অন্ধকার থেকে ভাষাকে আলোয় নিয়ে এসেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার সম্পর্কে লিখেছিলেন, মধুসূদনের এই সৃজনশীল প্রতিভা ছিল আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মতো। সেই আগুনের উত্তাপ আজও কমেনি।
২০২৬ সালে তার জন্মদিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত তার সেই লড়াকু মানসিকতাকে ধারণ করা। তিনি শিখিয়ে গেছেন যে, আধুনিক হওয়া মানে ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা নয়, বরং তাকে সমকালের উপযোগী করে নতুন প্রাণ দেয়া। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অট্টালিকা যত আকাশচুম্বীই হোক না কেন, তার গভীরে যে সুদৃঢ় ভিত্তিটি প্রোথিত, তার নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি ছিলেন, আছেন এবং আগামীর বাংলা সাহিত্যেও এক অপরাজেয় ধ্রুবতারা হয়ে থাকবেন।