জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার মানবতাবিরোধী অপরাধ

নানা নাটকীয়তার পর কামরুল ও মেননের বিচার শুরুর আদেশ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বৃহস্পতিবার নানা নাটকীয়তা ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়ার সূচনা হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

ট্রাইব্যুনাল আসামিপরে অব্যাহতির (ডিসচার্জ) আবেদন খারিজ করে দিয়ে মামলার তিনটি অভিযোগ পড়ে শোনান। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রাশেদ খান মেনন নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করে ন্যায়বিচার চান। অন্য দিকে কামরুল ইসলাম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেন। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম ও প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের জন্য আগামী ৯ জুন দিন ধার্য করা হয়েছে।

এদিন সকাল থেকেই কামরুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের বিষয়টি নিয়ে নাটকীয়তা তৈরি হয়। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি ট্রাইব্যুনালে আসতে অস্বীকৃতি জানান। বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ও চিফ প্রসিকিউটরের কাছে জানান কারা কর্তৃপ। এ সময় না আসার কারণ জানতে চান তারা। তবে কারা কর্তৃপরে যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে যেকোনো মূল্যে হাসপাতাল থেকে হাজির করতে কারা কর্তৃপকে মৌখিক নির্দেশ দেয় প্রসিকিউশন। বেলা সাড়ে ১১টার পর তাকে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার অপর আসামি ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকেও ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

প্রসিকিউশনের প থেকে বলা হয়, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেনন উসকানিমূলক ভূমিকা পালন করেছেন। আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ে থেকে তারা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন। তাদের প্ররোচনা ও ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশ এলাকায় গুলিবর্ষণে অন্তত ২৩ জন নিহত হন।

‘গ্যাসট্রিক ক্যানসারের’ কথা বলে ‘ভুয়া’ রিপোর্ট

শুনানি চলাকালে কামরুল ইসলামের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। প্রসিকিউশন দাবি করে, কারাবন্দী থাকা অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়াই কামরুল ইসলামের নামে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল এবং কামরাঙ্গীরচরের একটি সাধারণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম আদালতে প্রশ্ন তোলেন, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কারাবন্দী একজন আসামি কিভাবে নিজে উপস্থিত না হয়ে বা আদালতের অনুমতি ছাড়া এসব রিপোর্ট সংগ্রহ করলেন? প্রতিবেদনে উল্লিখিত ‘গ্যাসট্রিক ক্যানসার’ টার্মটি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে প্রসিকিউশন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আসামিকে বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরের পূর্বের আদেশ বাতিল (রিকল) করেন এবং এই বিতর্কিত কাগজপত্র কিভাবে সংগৃহীত হলো, তা ১৫ দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা করতে কামরুলের আইনজীবীদের নির্দেশ দেন।

পরে এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, পিজি হাসপাতালের পরিবর্তে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার অনুমতি চেয়ে একটি আবেদন করেছিল আসামিপ। এর পরিপ্রেেিত গত ৯ এপ্রিল একটি আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। তবে আদেশটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, রোগীকে না দেখে কিংবা তিনি ডাক্তারের কাছে না গিয়ে কি করে এই চিকিৎসাপত্র ট্রাইব্যুনালে আনলেন। কারণ দুটি কাগজই আমার কাছে এক ধরনের বানানো মনে হয়েছে।

চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনো ভুয়া বা জাল কাগজপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন আসামিপরে আইনজীবী আফতাব মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, জমা দেওয়া কাগজপত্র যে সঠিক, তা প্রমাণ করতে আমাদের ১৫ দিনের সময় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এই সময়ে বাংলাদেশ মেডিক্যালেই চিকিৎসাধীন থাকবেন কামরুল ইসলাম।

প্রসিকিউশনের ‘ভুয়া কাগজপত্রের’ অভিযোগ প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, ‘আজ যে কেস হিস্ট্রিটা দেয়া হয়েছে, সেটা কোনো মেডিক্যাল রিপোর্ট নয়; তার (কামরুল) কী কী সমস্যা রয়েছে, সেসবের একটি হিস্ট্রি মাত্র। যেহেতু তিনি জেল কর্তৃপরে অধীনে, তাই ব্যক্তিগতভাবে আমাদের চিকিৎসা দেয়ার সুযোগ নেই। তার ছেলেও একজন চিকিৎসক। মূলত ছেলের সাথে পরামর্শ করেই এই কেস সামারি দেয়া হয়েছে। আমাদের প থেকে কোনো ফেক (ভুয়া) কাগজ দেয়ার সুযোগ নেই।