ডিমলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংস্কার শুধু কাগজে-কলমে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন

Printed Edition
bangla-1
বৃষ্টিতে হাসপাতালের ফ্লোরে পানি জমে যাওয়ায় শিশুসন্তান নিয়ে সিঁড়িতে অবস্থান : নয়া দিগন্ত

রেজোয়ান ইসলাম ডিমলা (নীলফামারী)

সরকারি নথি ও খাতাপত্রে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরনো ভবনের সামগ্রিক সংস্কার ও আধুনিকায়ন বাবদ সাড়ে ১৭ লাখ টাকা খরচের হিসেব দেখানো হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্রে উঠে এসেছে এক করুণ ও বিপরীত চিত্র। হাসপাতালের শয্যা না পেয়ে চার মাসের এক রক্তসংক্রমণে আক্রান্ত শিশুকে নিয়ে মা সারারাত হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে কাটিয়েছেন। একইসাথে হাসপাতালের বারান্দায় তৈরি হয়েছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা, যার ফলে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্য মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরনো ভবনের জরুরি মেরামত ও সংস্কারের জন্য ১৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫১৯ টাকা ৫৯ পয়সা বরাদ্দ দেয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী কাজের দায়িত্ব পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খন্দকার এন্টারপ্রাইজ। কার্যাদেশের শর্তাবলীতে ওয়ার্ডের আধুনিকায়ন, নতুন টাইলস বসানো, দেয়াল রঙ করা, বৈদ্যুতিক সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং স্যানিটারি ও প্লামিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল। কাজের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ৬০ দিন। নথি অনুযায়ী সময়মতো কাজ শেষ দেখিয়ে বিলও উত্তোলন করা হয়েছে।

কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডের মোট ১১টি শয্যা বা বেড দীর্ঘ দিন ধরে ভাঙা ও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। নতুন করে যেসব টাইলস বসানো হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই খসে পড়তে শুরু করেছে। জিন এক্সপার্ট কক্ষের দরজা ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে এবং বেশ কয়েকটি কক্ষের রঙের কাজ অর্ধসমাপ্ত রাখা হয়েছে। এর বাইরে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত আলো না থাকায় রাতের বেলা পুরো এলাকা অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

গত শনিবার রাতে দক্ষিণ গয়াবাড়ী এলাকা থেকে চার মাসের শিশু তাসফিয়া জান্নাতকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন মা রিফা আক্তার। শিশুটি মারাত্মক রক্তসংক্রমণে ভুগছিল। তবে হাসপাতালে কোনো বেড খালি না থাকায় তাকে মুক্ত বারান্দায় চিকিৎসা দেয়া শুরু হয়। রাতে বৃষ্টি শুরু হলে বারান্দায় পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বাধ্য হয়ে রিফা আক্তার অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে সারারাত হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে থাকেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, চার মাসের এই অসুস্থ শিশুকে নিয়ে সারা রাত হাসপাতালের সিঁড়িতে বসে কাটাতে হলো।

মোকছেদ আলী এক মাসের অসুস্থ নাতনীকে নিয়ে দুই দিন ধরে হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতে অবস্থান করছেন। মোকছেদ আলী বলেন, মেঝেতে চিকিৎসা নেয়া এমনিতেই কষ্টকর, তার ওপর বৃষ্টি নামলে বারান্দায় পানি চলে আসে। তখন ছোট নাতনীকে কোলে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স খন্দকার এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ মনসুর রহমান এবং স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মনি কুমার শর্মার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। তবে নীলফামারী জেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী নিতাই চন্দ্র বর্মন জানান, কাজের তদারকি করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অংশগুলো সম্পন্ন করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক ইউএইচঅ্যান্ডএফপিও ডা: রাশেদুজ্জামান রাশেদ বলেন, আমার জানামতে কাজগুলো নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে সরেজমিন যেসব অনিয়মের কথা উঠে আসছে, তা খতিয়ে দেখে সমাধান করা প্রয়োজন। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত ইউএইচ অ্যান্ড এফপিও ডা: আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ সরাসরি পরিচালনা করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। কার্যাদেশে কী কী কাজের উল্লেখ ছিল তা নথি না দেখে বলা সম্ভব নয়। তবে রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানানো হবে।