আজ মহান ৫ আগস্ট। দুই বছর আগে এই দিনে বর্ষা বিপ্লব সফল হয়। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা রক্তস্নাত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জাতির ঘাড় থেকে ফ্যাসিবাদ উৎখাত করে। স্বাধীনতা ও মুক্তির এক নতুন স্বাদ পেয়েছে জাতি। খুলে দিয়েছে জাতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। বিশ্ববাসী দেখেছেন এক তাৎপর্যপূর্ণ বিপ্লব। জাতীয় জীবনে এই দিনটি অম্লান হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু দিন শুধু বর্ষপঞ্জির একটি তারিখ মাত্র নয়। এসব দিন বরং জাতীয় আত্মপরিচয়, প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের প্রতীক। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী জমানার অবসানে চব্বিশের ৫ আগস্ট এমনই একটি দিন; যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, জনআকাক্সক্ষা এবং পরিবর্তনের দাবি নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছিল।

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। তখন থেকে নির্বাচনব্যবস্থা নির্বাসনে দিয়ে দেশে কার্যত একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী এবং ভিন্নমত দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে গুম-খুন ও হত্যা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মূলত সারা দেশ ছিল একটি করাগার। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মুষ্টিমেয় ছাড়া সবাই উন্মুখ ছিলেন। তাদের সেই পরম চাওয়া পূর্ণতা পায় ছাত্র-জনতার টানা ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগ্রামে; শেখ হাসিনার পতনে।

৫ আগস্টকে কেউ গণ-অভ্যুত্থান, কেউ বিপ্লব, আবার কেউ রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখেন। ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশের মানুষ একটি অধিক জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা প্রকাশ করেছিল।

বিপ্লবের প্রকৃত চেতনা কেবল শাসক পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল শক্তি নিহিত থাকে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরো ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ এবং মানবিক করে তোলার অঙ্গীকারে। মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা- এসবই সেই চেতনার অপরিহার্য উপাদান। যদি এসব মূল্যবোধ সময়মতো প্রতিষ্ঠিত না হয়, যেকোনো বৈপ্লবিক অর্জন সময়ের সাথে সাথে ম্লান হয়ে যায়।

ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা। একই সাথে প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচারের পথ অনুসরণ করা। মতভেদ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু সহিংসতা, ঘৃণা ও বিভাজন কখনো একটি দেশের স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না। তাই ভিন্নমতকে সম্মান জানিয়ে সংলাপ, সহনশীলতা এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রযন্ত্রে আমূল সংস্কার করাই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তি।

তরুণ প্রজন্মের উদ্যম, সচেতনতা ও নাগরিক দায়বদ্ধতা দেশের জন্য এক মূল্যবান সম্পদ। সেই শক্তিকে গঠনমূলক কাজে যেমন- শিক্ষা, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সামাজিক সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশে ব্যবহার করা হবে প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি।

চব্বিশের ৫ আগস্ট ভবিষ্যতের দায়িত্বকে নতুন করে উপলব্ধি করার একটি সুযোগ। যেখানে রাষ্ট্রের শক্তি জনগণের আস্থায়। উন্নয়নের ভিত্তি ন্যায়বিচারে। অগ্রগতির চালিকাশক্তি হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ও আইনের শাসন।

৫ আগস্টের মর্যাদা রক্ষা পাবে যদি এর চেতনা প্রতিদিনের রাষ্ট্রচর্চা ও নাগরিক জীবনে প্রতিফলন ঘটে।