বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন দাঁড়িয়ে আছে জটিল সন্ধিসময়ে। রফতানি আয়ে যে গতি থাকার কথা, সেটি দেখা যাচ্ছে না। বিদেশী সহায়তায় ভাটা পড়েছে। সেই সাথে বাড়ছে ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ। এই তিন চাপে আছে দেশের বৈদেশিক খাত।
গতকাল এ বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নয়া দিগন্ত। এতে বৈদেশিক খাত নিয়ে অর্থনীতিবিদদের শঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়। তারা বলছেন, রফতানির প্রবৃদ্ধি দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘুরে না দাঁড়ালে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশী ঋণ না বাড়লে চাপ আরো বাড়তে পারে। সামনের মাসগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার ও চলতি হিসাবের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিদায়ী অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তা ছাড় কমেছে। নিট অর্থপ্রবাহ বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়ে ৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অন্য দিকে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় ঋণ পরিশোধের দায় এক বছরে ১০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে। আয় কমার বিপরীতে পরিশোধের এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ সামষ্টিক অর্থনীতির মূল ভিত্তিগুলোকে চাপের মুখে ফেলছে।
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার রফতানি খাতের চিত্র স্বস্তিতে থাকার মতো নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে পণ্য রফতানি পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ শতাংশ কমেছে। তৈরী পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে। এটি পুরো অর্থনীতির জন্যই উদ্বেগের। যদিও জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে সাময়িক পুনরুদ্ধার লক্ষ করা গেছে। ভারত ও সৌদি আরবের মতো অপ্রচলিত বাজারগুলোতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিক বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার মতো গতি এখনো আসেনি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা তৈরি করেছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি। প্রতিশ্রুত বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ ছাড় না হওয়ার অন্যতম কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা। নতুন সহায়তার প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া এবং নিট অর্থপ্রবাহের দরপতন ইঙ্গিত দিচ্ছে- বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবহারে দক্ষতা না বাড়ালে আগামী দিনগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হবে। চলতি হিসাবের ভারসাম্য ও টাকার বিনিময় হারের ওপর চাপ আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। কেবল বাজেট সহায়তার ওপর ভর করে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া কতটা সম্ভব হবে?
আমরা মনে করি, এই সঙ্কট মোকাবেলায় নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে কৌশলগত ও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। আটকে থাকা ও প্রতিশ্রুত বৈদেশিক ঋণ দ্রুত ছাড় নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাধা দূর করা জরুরি। কেবল তৈরী পোশাকের ওপর নির্ভর না করে উচ্চ মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদন এবং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার মতো নতুন বাজারগুলোতে রফতানি বাড়ানো প্রয়োজন। এর জন্য সমন্বিত নীতি সহায়তা দেয়া জরুরি।
আশার দিক হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো শক্তিশালী আছে। ভারত, সৌদি আরবসহ কয়েকটি অপ্রচলিত বাজারে রফতানি বাড়ছে। আগামী শরৎ ও উৎসব মৌসুমে নতুন রফতানি আদেশ বাড়লে জুলাইয়ের সাময়িক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে। এই আশাকে টেকসই করতে হলে অভ্যন্তরীণ প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।