সুদান ও সোমালিয়ায় ব্রিটেনের দ্বিমুখী নীতি

Printed Edition

আলজাজিরার মন্তব্য

ডিসেম্বরে সুদানের সেনাবাহিনী ও র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর চলমান যুদ্ধে ব্রিটেন দায়বদ্ধতার আহ্বান জানায় এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যু ও ধ্বংসলীলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু দেখা গেছে, পর্দার আড়ালে যুক্তরাজ্য সহিংসতা ঠেকাতে আরো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।

পূর্ব আফ্রিকায় ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সমর্থন করে, অথচ স্বীকৃতি না দেয়া বিচ্ছিন্ন অঞ্চল সোমালিল্যান্ডের বেরবেরা বন্দরে তাদের আর্থিক অংশীদারিত্ব রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের কথার সাথে কাজের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সুদানি নীতি বিশ্লেষক আমগাদ ফারিদ এলতাইয়েব বলেন, ব্রিটেনের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন নির্ভর করছে তারা কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘যখন মানুষ দেখে আপনার কথা ও কাজ আলাদা, তখন তারা আপনাকে মধ্যস্থতাকারী নয়; বরং স্বার্থ রক্ষাকারী হিসেবে দেখে।’

সুদানে ‘আগ্রাসনের সহায়ক’

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারণা এখন ব্রিটেনের অন্যান্য পদক্ষেপকেও প্রভাবিত করছে। সুদানে ব্রিটেন সরকার রক্তপাত বন্ধে অভ্যন্তরীণ নথিতে বর্ণিত ‘সবচেয়ে কম উচ্চাভিলাষী’ পথ বেছে নেয়। অথচ দারফুরে আরএসএফ-এর গণহত্যা বেড়েই চলছিল। আলতাইয়েব বলেন, এতে ব্রিটেনকে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় দেখা হচ্ছে, যার কূটনৈতিক অবস্থান যুদ্ধকে আন্তর্জাতিকভাবে কিভাবে উপস্থাপন করা হবে তা প্রভাবিত করছে। তিনি উল্লেখ করেন, আরব আমিরাত আরএসএফ-কে অস্ত্র দিয়েছে বলে জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে। আবুধাবি তা অস্বীকার করেছে। এলতাইয়েব বলেন, যুক্তরাজ্য ‘আমিরাতি আগ্রাসনের সহায়ক’ হয়ে উঠেছে এবং আরএসএফ-এর নৃশংসতাকে কূটনৈতিকভাবে আড়াল করছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দফতর আলজাজিরাকে জানায়, ‘সুদানের সঙ্কট কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। আমরা সহিংসতা বন্ধ ও আরো নৃশংসতা ঠেকাতে কাজ করছি। উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা ও বেসামরিক সরকারে রূপান্তরের পথে আসতে হবে।’

সোমালিয়া স্বীকৃতি, সোমালিল্যান্ডে ব্যবসা

সোমালিয়া বা সোমালিল্যান্ডে ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি পররাষ্ট্র দফতর। বেরবেরা বন্দরে তাদের অংশীদারিত্ব রয়েছে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট (বিআইআই)-এর মাধ্যমে। বন্দরের মালিকানা ভাগাভাগি করছে ইউএই-ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সোমালিল্যান্ড সরকার, যদিও ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয় না।

বেরবেরা লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ব্রিটেনের এক মূল্যায়নে এটিকে ‘কৌশলগত প্রবেশদ্বার’ বলা হয়েছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ইতিহাসবিদ ম্যাথিউ স্টার্লিং বেনসন বলেন, বেরবেরা সবসময় বাইরের শক্তির কাছে কৌশলগত অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হয়েছে- কখনো ব্রিটিশ কয়লাঘাট, কখনো সোভিয়েত নৌঘাঁটি, এখন বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

সুদান-সোমালিল্যান্ড সংযোগ

সুদানের যুদ্ধ সীমান্ত ছাড়িয়ে যাওয়ায় বেরবেরার গুরুত্ব বেড়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি আমিরাতি লজিস্টিক নেটওয়ার্কের অংশ, যা আরএসএফ-কে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে অভিযুক্ত। ইউএই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সমালোচকরা বলছেন, ব্রিটেনের এই আর্থিক সম্পৃক্ততা প্রশ্ন তুলছে। সুদানে দায়বদ্ধতার আহ্বান জানালেও তারা এমন এক বন্দরে বিনিয়োগ করছে যা আমিরাত পরিচালনা করছে। বিশ্লেষক আবদালফতাহ হামেদ আলি বলেন, এটি ‘নীতির সাথে বাস্তবতার ফাঁক’ তুলে ধরছে।

সোমালিল্যান্ডের রাজনৈতিক অবস্থান

গত মাসে ইসরাইল একমাত্র দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মোগাদিশু ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা প্রত্যাখ্যান করেছে। আলি বলেন, বেরবেরাকে নিরপেক্ষ বাণিজ্যিক সম্পদ হিসেবে দেখা যায় না। ‘বন্দর শুধু অর্থনৈতিক নয়, নিরাপত্তা ও প্রভাবের কেন্দ্র। বিনিয়োগ মানে রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করা।’

তিনি ব্রিটেনের নীতিকে ‘দ্বিমুখী’ বলে বর্ণনা করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তারা সোমালিয়ার সাথে সম্পর্ক রাখে, আবার সোমালিল্যান্ডকে কার্যত স্বীকৃতি দিয়ে কাজ করে। বেনসন ব্যাখ্যা করেন, ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর সোমালিল্যান্ড আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বড় ধরনের সাহায্য পায়নি।